চলতি আইএসএল মরশুমের শুরুটা এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারত! ঘরের মাঠে নেমেই দাপুটে জয় তুলে নিল East Bengal FC। ২০২৫-২৬ মরশুমের প্রথম ম্যাচে তারা ৩-০ গোলে হারিয়ে দিল NorthEast United FC-কে। পুরো ম্যাচজুড়ে লাল-হলুদের আধিপত্য এতটাই স্পষ্ট ছিল যে শেষ বাঁশি বাজার আগেই সমর্থকেরা জয়ের গন্ধ পেয়ে গিয়েছিলেন।
এই জয় শুধু তিন পয়েন্ট নয়, আত্মবিশ্বাসের বড় বার্তাও বটে। নতুন মরশুমে দল যে বদলে গেছে, আরও ধারালো হয়েছে, তা মাঠেই প্রমাণ করে দিল ইস্টবেঙ্গল।
ম্যাচের প্রথম ৪৫ মিনিট ছিল বেশ টানটান উত্তেজনার। শুরু থেকেই বল দখলে এগিয়ে ছিল ইস্টবেঙ্গল। মাঝমাঠে দ্রুত পাস, দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ—সব মিলিয়ে তারা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। কিন্তু গোলের মুখ খুলতে পারেনি।
নর্থইস্টও চুপ করে বসে থাকেনি। পাল্টা আক্রমণে তারা কয়েকবার চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে জিতিন এমএস আক্রমণভাগে গতি আনেন। একবার তো রশিদের জোরালো শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ওই মুহূর্তে গোটা স্টেডিয়াম নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখছিল। গোল হয়ে গেলে ম্যাচের চেহারা বদলাতেই পারত।
তবে প্রথমার্ধ শেষ হয় ০-০ সমতায়। তখন মনে হচ্ছিল, এই ম্যাচ হয়তো খুব হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে চলেছে।
বিরতির পর যেন অন্য এক ইস্টবেঙ্গলকে দেখা গেল। গতি বাড়ল, আক্রমণে তীক্ষ্ণতা এল। ৬৫ মিনিটে অবশেষে জালের ঠিকানা খুঁজে পেল লাল-হলুদ শিবির।
স্প্যানিশ তারকা Cleiton Silva (ইজেজারি নামে পরিচিত) দুর্দান্ত ফিনিশে প্রথম গোলটি করেন। গোলের পর সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে স্টেডিয়াম কেঁপে ওঠে। সেই গোল যেন দলের ভিতরের সব চাপ ঝেড়ে দেয়।
মাত্র ছয় মিনিট পর, ৭১ মিনিটে আবারও তিনি। ডিফেন্সের ফাঁক গলে নিখুঁত শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। এক কথায়, ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি একাই। দুই গোল করে ম্যাচের নায়ক হয়ে ওঠেন।
যখন নর্থইস্ট ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই শেষ আঘাতটা আসে ইনজুরি টাইমে। ৯০+২ মিনিটে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড মিগুয়েল তৃতীয় গোলটি করেন। এই গোলের পর আর কোনও সন্দেহ থাকেনি—জয় নিশ্চিত।
৩-০ ব্যবধানে ম্যাচ শেষ হয়। লাল-হলুদ সমর্থকেরা খুশিতে আত্মহারা। অনেকেই বলছিলেন, গত মরশুমের তুলনায় দল অনেক বেশি সংগঠিত এবং আত্মবিশ্বাসী।
এই ম্যাচে কেবল গোল নয়, সামগ্রিক খেলাতেও এগিয়ে ছিল ইস্টবেঙ্গল। বল দখল, পাসিং অ্যাকুরেসি, আক্রমণের সংখ্যা—সব ক্ষেত্রেই তারা আধিপত্য দেখায়। মাঝমাঠ থেকে খেলা গড়ে তোলা এবং উইং ব্যবহার করে আক্রমণ করা—এই কৌশল নর্থইস্টের ডিফেন্সকে বারবার সমস্যায় ফেলে।
অন্যদিকে, নর্থইস্ট ইউনাইটেড বল দখলের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ে। তারা কাউন্টার অ্যাটাকে ভরসা করলেও শেষ পর্যন্ত কার্যকর ফিনিশিংয়ের অভাবে ম্যাচে ফিরতে পারেনি।
গতবার গুয়াহাটিতে এই নর্থইস্টের কাছেই বড় ব্যবধানে হেরেছিল ইস্টবেঙ্গল। সেই স্মৃতি সমর্থকদের মনে এখনও টাটকা। তাই এই জয় যেন একপ্রকার বদলা নেওয়া। ঘরের মাঠে সমর্থকদের সামনে এমন পারফরম্যান্স দলকে মানসিকভাবে অনেক শক্তি দেবে।
শেষ পাঁচ দেখায় দুই দলই সমান সংখ্যক ম্যাচ জিতেছিল। ফলে এই ম্যাচ নিয়ে আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। অনেকেই ভেবেছিলেন ম্যাচ ড্র হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ইস্টবেঙ্গল একতরফা দাপট দেখিয়ে দিল।
Indian Super League-এর নতুন মরশুমে শুরুটা যেভাবে হল, তাতে স্পষ্ট—ইস্টবেঙ্গল এবার বড় লক্ষ্য নিয়েই নামছে। শুধু অংশগ্রহণ নয়, শিরোপার লড়াইয়ে নিজেদের নাম লেখাতে চায় তারা।
দলের আক্রমণভাগ যেমন ধারালো, তেমনি রক্ষণও আজ শক্তপোক্ত দেখাল। গোল না খাওয়াটাও বড় সাফল্য। কোচের কৌশল এবং খেলোয়াড়দের সমন্বয়—দুটোই কাজ করেছে।
ম্যাচ শেষে গ্যালারিতে একটাই সুর—“এইবার কিছু বড় হোক।” প্রথম ম্যাচেই এমন জয় মানে আশা বাড়ছে। তবে মরশুম এখনও দীর্ঘ। ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই হবে আসল চ্যালেঞ্জ।
তবুও শুরুটা যদি এমন হয়, তাহলে স্বপ্ন দেখতে দোষ কোথায়? লাল-হলুদ সমর্থকেরা এখন নতুন উদ্যমে সামনে তাকিয়ে। ইজেজারির জোড়া গোল আর মিগুয়েলের শেষ হাসি—সব মিলিয়ে আইএসএল ২০২৫-২৬ মরশুমের প্রথম ম্যাচটাই হয়ে রইল স্মরণীয়।
ইস্টবেঙ্গল যে শুধু জিতেছে তা নয়, জিতে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে। এখন দেখার, এই দাপট তারা পুরো মরশুম জুড়ে বজায় রাখতে পারে কি না। তবে আজকের রাতটা নিঃসন্দেহে লাল-হলুদের।


