ভারতীয় ক্রিকেট মানেই এখন শুধু খেলা নয়, এটা এক বিশাল ব্যবসা। আর সেই ব্যবসার সবচেয়ে বড় মঞ্চ হলো আইপিএল। সাম্প্রতিক সময়ে আইপিএলের দুটি জনপ্রিয় দল, রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু ও রাজস্থান রয়্যালসের মালিকানা বদল নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল আলোড়ন। এই লড়াইয়ে নাম লিখিয়েছেন আমেরিকার দুই প্রভাবশালী ধনকুবের, সঙ্গে রয়েছেন ভারতের নামী শিল্পপতিরাও। পুরো বিষয়টা এখন একেবারে সিনেমার গল্পের মতো রোমাঞ্চকর।
আইপিএল এখন বিশ্বের অন্যতম লাভজনক ক্রীড়া লিগ। ফুটবল বা বাস্কেটবলের মতোই এখানে বিনিয়োগ করে অল্প সময়ে বড় লাভ করার সুযোগ রয়েছে। সেই কারণেই আমেরিকার ক্রীড়া-বিনিয়োগকারীরা আইপিএলের দিকে তাকাচ্ছেন নতুন সম্ভাবনার বাজার হিসেবে।
এই দৌড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন ডেভিড ব্লিজ়ার। তিনি হ্যারিস ব্লিজ়ার স্পোর্টস অ্যান্ড এন্টারটেনমেন্টের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সূত্রের খবর অনুযায়ী, তিনি রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু ও রাজস্থান রয়্যালস—দু’টি দলের কর্তৃপক্ষের সঙ্গেই নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
অন্যদিকে রয়েছেন আব্রাম গ্লেজার, যিনি বিশ্বের ক্রীড়া-বিনিয়োগ জগতে এক পরিচিত নাম। এই দুই আমেরিকান ধনকুবেরের মুখোমুখি লড়াই এখন আইপিএলের বাজারকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু মানেই বিরাট কোহলি। মাঠে ট্রফি না এলেও ব্র্যান্ড ভ্যালুর দিক থেকে দলটি সবসময় শীর্ষে। সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, বেঙ্গালুরুর বাজার মূল্য উঠতে পারে প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ভারতীয় টাকায় প্রায় ১৬ হাজার কোটিরও বেশি।
অন্যদিকে রাজস্থান রয়্যালস তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হলেও ব্যবসায়িক লাভের দিক থেকে চমকপ্রদ। গত কয়েক বছরে তাদের মুনাফা বেড়েছে দ্রুতগতিতে। বিনিয়োগকারীদের কাছে এই দল ভবিষ্যতের সোনার খনি বলেই মনে হচ্ছে।
এই লড়াই শুধু আমেরিকা বনাম আমেরিকাতে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের বড় শিল্পপতিরাও ইতিমধ্যেই দরপত্র জমা দিয়েছেন। বেঙ্গালুরু কেনার দৌড়ে রয়েছেন আদার পুনাওয়ালা এবং রঞ্জন পাই। দু’জনেই আলাদা আলাদা ভাবে বিড করেছেন।
এই কারণে বেঙ্গালুরুর মালিকানা পাওয়ার লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেকের ধারণা, এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার বিনিয়োগকারীরা হয়তো রাজস্থান রয়্যালসের দিকেই বেশি ঝুঁকবেন।
ডেভিড ব্লিজ়ারের বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা কিন্তু কম নয়। তাঁর বিনিয়োগ রয়েছে এনবিএ ও এনএইচএলের মতো বড় লিগে। অন্যদিকে আব্রাম গ্লেজারের মালিকানায় রয়েছে এনএফএলের দল টাম্পা বে বুকানিয়ার্স। দু’জনেই জানেন, ক্রীড়া দল মানে শুধু খেলা নয়, এটা দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ড।
এই দু’জনের লক্ষ্য একটাই—আইপিএলের বাজারে শক্ত পায়ের জায়গা তৈরি করা। তাঁরা প্রয়োজনে যৌথ বিনিয়োগ গোষ্ঠী তৈরি করতেও রাজি। সেই গোষ্ঠীতে ভারতীয় সংস্থা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বেঙ্গালুরুর বর্তমান মালিকানা রয়েছে যুক্তরাজ্যের একটি পানীয় সংস্থার ভারতীয় শাখার হাতে। অন্যদিকে রাজস্থানের মালিক লন্ডনপ্রবাসী শিল্পপতি মনোজ বাদাল। দুই পক্ষই বিসিসিআইকে জানিয়েছে, তারা আর আইপিএলে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী নয়।
এরপর থেকেই বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বিনিয়োগ সংস্থা আইপিএলের বাজার মূল্যায়ন শুরু করে। এই মূল্যায়ন রিপোর্টই মূলত আমেরিকার ধনকুবেরদের আরও উৎসাহিত করেছে।
আইপিএল শুধু ভারতের জন্য নয়, বিশ্ব ক্রিকেটের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে আমেরিকার বাজারে জনপ্রিয় করতে চায়। সেই লক্ষ্য পূরণে আইপিএলে আমেরিকান বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ খুবই ইতিবাচক সংকেত।
ভাবুন তো, যাঁরা এনএফএল বা এনবিএর মতো লিগে বিনিয়োগ করেন, তাঁরা যদি আইপিএলে ঢোকেন, তাহলে ক্রিকেটের গ্লোবাল বাজার কতটা বড় হতে পারে।
আগামী মার্চের মধ্যেই দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময়। এরপরই পরিষ্কার হবে, বেঙ্গালুরু ও রাজস্থানের নতুন মালিক কে হচ্ছেন। কেউ এককভাবে দল কিনবেন, নাকি যৌথ গোষ্ঠী গড়ে মালিকানা নেবেন—সব কিছুর উত্তর মিলবে খুব শিগগিরই।
একটা বিষয় নিশ্চিত, ভারত ও আমেরিকার চার ধনকুবেরের এই লড়াই আইপিএলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করতে চলেছে। মাঠের বাইরের এই যুদ্ধও যে কতটা উত্তেজনাপূর্ণ হতে পারে, সেটা আবারও প্রমাণ করে দিল আইপিএল।



