জয়টা যেন কেবল সময়ের অপেক্ষা ছিল। মাঠে নামার আগেই অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, ফলাফল কোন দিকে যাবে। আর মাঠের ৪০ মিনিটে সেটারই নিখুঁত প্রমাণ দিল বাংলাদেশের মেয়েরা।
রবিবার (২৫ জানুয়ারি) সাফ নারী ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপের লিগ পর্বের শেষ ম্যাচে মালদ্বীপকে ১৪-২ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে প্রথম আসরের শিরোপা জিতে নিয়েছে বাংলাদেশ।
সাবিনা খাতুন, কৃষ্ণা রানী সরকার ও লিপি আক্তারের দাপুটে নৈপুণ্যে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে একচেটিয়া আধিপত্য দেখাল লাল-সবুজের দল।
ছয় ম্যাচে পাঁচটি জয় ও একটি ড্র। মোট ১৬ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষে থেকেই ট্রফি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। অন্যদিকে মালদ্বীপ টানা পাঁচ ম্যাচ হেরে এক পয়েন্টও তুলতে পারেনি। শক্তি, গতি আর কৌশলে দুই দলের পার্থক্য ছিল স্পষ্ট। শেষ ম্যাচে সেটা আরও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সাবিনারা।
ম্যাচের শুরুটা কিন্তু বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির ছিল না। ব্যাংককে ম্যাচের চতুর্থ মিনিটেই চমক দেয় মালদ্বীপ। সানিয়া ইব্রাহিমের টোকায় বল বাংলাদেশের জালে ঢুকে যায়। গোলরক্ষক ঝিলির গ্লাভস ছুঁয়ে বল থামানোর চেষ্টা করেছিলেন মাসুরা পারভীন। কিন্তু একাধিক চেষ্টাতেও কাজ হয়নি। হঠাৎ এই গোল কিছুটা চাপে ফেলে দেয় বাংলাদেশকে।
কিন্তু এই চাপই যেন মেয়েদের আরও ক্ষুধার্ত করে তোলে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ম্যাচে ফিরে আসে বাংলাদেশ।
মালদ্বীপের লিড বেশিক্ষণ টেকেনি। দূরপাল্লার ফ্রি কিক থেকে অসাধারণ এক শটে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। ওই গোলটাই ছিল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত। এরপর থেকেই একের পর এক আক্রমণে ভেঙে পড়ে মালদ্বীপের রক্ষণ।
এরপর সার্কেলের ভেতরে কৃষ্ণা রানী সরকার ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় বাংলাদেশ। সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেননি সাবিনা। পোস্টের বাইরে শট চলে যায়। কিন্তু সেই মিসের কোনো প্রভাব পড়েনি দলের আত্মবিশ্বাসে। কিছুক্ষণ পর আবারও ফ্রি কিক থেকে গোল করে ব্যবধান বাড়ান সাবিনা।
প্রথমার্ধের শেষ পাঁচ মিনিটে যেন গোলের বন্যা বইয়ে দেয় বাংলাদেশ। সাবিনার পাস থেকে কৃষ্ণা রানী সরকার দূরূহ কোণ থেকে গোল করে স্কোরলাইন ৩-১ করেন। এরপর কৃষ্ণার পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে লিপি আক্তারকে বল বাড়ান নিলুফা আক্তার নীলা। লিপির টোকায় ব্যবধান আরও বাড়ে।
১৯ মিনিটে সার্কেলের ভেতর থেকে লিপি আক্তার গোল করেন। ঠিক পরের মুহূর্তেই রওশন জাহানের গোল। বিরতিতে যাওয়ার সময় স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৬-১। ম্যাচ তখন পুরোপুরি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে।
বিরতির পর মাঠে ফিরে এক মুহূর্তের জন্যও গতি কমায়নি বাংলাদেশ। দ্বিতীয়ার্ধের তৃতীয় মিনিটেই দূরপাল্লার শটে নিজের হ্যাটট্রিক পূরণ করেন সাবিনা খাতুন। একটু পর মাতসুশিমা সুমাইয়ার গোল। পঞ্চম মিনিটে ডান পায়ের বুলেট শটে আবারও জাল কাঁপান সাবিনা। স্কোরলাইন তখন ৯-১।
এরপর নিলুফা আক্তার নীলা গোল করে দলকে দশম গোল উপহার দেন। ম্যাচের ৩০ মিনিটে সাবিনার উৎস থেকে কৃষ্ণার দারুণ পাসে লিপি আক্তার পায়ের টোকায় নিজের হ্যাটট্রিক পূরণ করেন। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ১১-১।
গোলের তালিকায় নাম লেখান কৃষ্ণা রানী সরকারও। ডান পায়ের শক্তিশালী শটে জাল কাঁপান তিনি। এরপর অভিষেক গোল করেন মেহেরুন। ম্যাচের ৩৬ মিনিটে গোলকিপারের ফাঁক দিয়ে মাসুরা পারভীন দলকে এনে দেন ১৪তম গোল।
শেষ দিকে মালদ্বীপের মারিয়া একটি গোল শোধ করলেও তাতে ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়েনি। বড় ব্যবধানের হার নিয়েই মাঠ ছাড়ে তারা।
এই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন সাবিনা খাতুন ও লিপি আক্তার। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই এই তিন ফুটবলার ছিলেন বাংলাদেশের আক্রমণের মূল শক্তি। গতি, পাসিং, ফিনিশিং—সব দিক থেকেই তাঁরা ছিলেন এক ধাপ এগিয়ে।
সাবিনার নেতৃত্বে দল ছিল আত্মবিশ্বাসী। কৃষ্ণার দৌড় ও পাসে বারবার ভেঙেছে প্রতিপক্ষের রক্ষণ। আর লিপি সুযোগ পেলেই তা গোল করে ফিরিয়েছেন।
এটাই সাফ নারী ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসর। সেই প্রথম আসরেই শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা। এই সাফল্য শুধু একটি ট্রফি নয়, বরং বাংলাদেশের নারী ফুটবলের অগ্রযাত্রার আরেকটি বড় প্রমাণ।
এই জয় দেখিয়ে দিল, সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস থাকলে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও বাংলাদেশ দাপট দেখাতে পারে।
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই উৎসবে মেতে ওঠে বাংলাদেশের মেয়েরা। মাঠেই শুরু হয় শিরোপা উদযাপন। হাসি, আনন্দ আর গর্বে ভরে ওঠে পুরো দল। কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে খেলোয়াড়—সবার চোখেমুখে ছিল তৃপ্তির ছাপ।
এই সাফল্য ভবিষ্যতে আরও বড় মঞ্চে ভালো করার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। সাফ ফুটসালের প্রথম ট্রফি জিতে বাংলাদেশের মেয়েরা যে বার্তা দিল, তা খুব স্পষ্ট—এরা থামতে আসেনি, আরও অনেক দূর যেতে চায়।


