টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশের স্বপ্নটা এখন প্রায় দোলাচলে। মাঠের ক্রিকেট নয়, এই মুহূর্তে লড়াইটা হচ্ছে বোর্ডরুমে। আর সেই লড়াইয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড প্রায় একা। পাকিস্তান ছাড়া আর কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। আইসিসির বোর্ড সভায় ভোটাভুটিতে সেটাই স্পষ্ট হয়ে গেছে। প্রশ্ন একটাই—শেষ মুহূর্তে কি অবস্থান বদলাবে বাংলাদেশ, নাকি বিশ্বকাপটাই হাতছাড়া হবে?
বুধবারের আইসিসি বোর্ড সভা ছিল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ষোলোটি পূর্ণ সদস্য দেশের ভোটে ঠিক হয়ে গেছে, বাংলাদেশ যদি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে চায়, তবে তাদের ভারতে এসে খেলতেই হবে। বিকল্প কোনও ভেন্যু দেওয়া হবে না। ভোটের ফল ছিল একপেশে—১৪-২।
বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দেয় শুধু দুই দেশ। এক, বাংলাদেশ নিজে। দুই, পাকিস্তান। বাকি সবাই সরাসরি বিপক্ষে। এই ফলাফল বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা। কারণ এতদিন ধরে বিসিবি যে অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই দাবিকে কার্যত বাতিল করে দিল আইসিসি।
এই পুরো বিতর্কের শুরু মুস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে। আইপিএল থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে বিসিবি। বোর্ডের যুক্তি ছিল একদম পরিষ্কার। যদি একজন ক্রিকেটারকে যথাযথ নিরাপত্তা দেওয়া না যায়, তাহলে পুরো দল, সাপোর্ট স্টাফ, মিডিয়া এবং সমর্থকদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
বাংলাদেশ বোর্ড বরাবরই বলে এসেছে, ভারত বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে নিরাপদ নয়। সেই কারণেই তারা বিশ্বকাপের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের প্রস্তাব দেয়। শ্রীলঙ্কা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, দর্শকও বেশি আসবে—এমন যুক্তিও তুলে ধরে বিসিবি।
আইসিসি এবং বাংলাদেশ বোর্ডের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে। আলোচনা হয়েছে, যুক্তি দেওয়া হয়েছে, পাল্টা যুক্তিও এসেছে। কিন্তু কোনও সমাধান বের হয়নি। শেষ পর্যন্ত আইসিসি জরুরি বোর্ড সভা ডেকে বিষয়টি ভোটাভুটিতে নিয়ে যায়।
সেখানেই পরিষ্কার হয়ে যায়, বাংলাদেশের দাবির প্রতি আন্তর্জাতিক মহলে সমর্থন নেই বললেই চলে। অনেক বোর্ড সদস্যই সরাসরি বলেন, কোনও দেশের চাপে নতজানু হওয়া উচিত নয়। নিয়ম একটাই—খেলতে চাইলে নির্ধারিত ভেন্যুতেই খেলতে হবে।
এখন বিসিবির অন্দরমহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা ঘুরছে এই জায়গাতেই। কেন শুধু পাকিস্তান পাশে দাঁড়াল? জিম্বাবুয়ের সঙ্গে নিয়মিত সিরিজ খেলে বাংলাদেশ। সেই জিম্বাবুয়ে কেন সমর্থন দিল না? শ্রীলঙ্কা, যেখানে ম্যাচ হলে দর্শকসংখ্যা বাড়ত, তারাই বা কেন বিপক্ষে ভোট দিল?
এই প্রশ্নগুলোর কোনও স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই। তবে বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এই মুহূর্তে প্রভাব খাটাতে পারেনি। বোর্ড মিটিংয়ে সেটা চোখে পড়ার মতো।
চাপে পড়েও বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল জানিয়েছেন, বোর্ডের অবস্থান বদলায়নি। তাঁর বক্তব্য, ভারত এখনও বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ নয়। বিসিবি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আইসিসির তরফে কোনও অলৌকিক সমাধানের অপেক্ষায় আছে।
তবে বাস্তবে একটা জিনিস পরিষ্কার। আইসিসি বাংলাদেশকে নতুন করে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়েছে। বৃহস্পতিবারের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। খেলবে কি খেলবে না, সেটা পরিষ্কারভাবে বলতে হবে।
এই সময়সীমা মেনে নেওয়াটাই অনেক প্রশ্ন তৈরি করছে। যদি বিসিবি একেবারেই অনড় থাকত, তাহলে বুধবারই তারা ‘ভারতে খেলব না’ বলে দিতে পারত। কিন্তু তা না করে একদিন সময় চাওয়ার মানে হলো, ভেতরে ভেতরে আলোচনা চলছে।
এই সিদ্ধান্তে শুধু বিসিবি নয়, বাংলাদেশ সরকারও বড় ফ্যাক্টর। জানা গেছে, আজ দুপুরে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে বিশ্বকাপ স্কোয়াডের বৈঠক হবে। সেখানে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে জানানো হবে।
সরকার কেন ভারতকে নিরাপদ মনে করছে না, সেই ব্যাখ্যাও দেওয়া হবে। পাশাপাশি ক্রিকেটারদের সামনে পরবর্তী করণীয়ও তুলে ধরা হবে। আপাতত সরকার জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের দিকেই ঝুঁকে আছে। অর্থাৎ, ভারত বয়কট।
কিন্তু এখানে একটা টুইস্ট আছে।
যদি ক্রিকেটাররা সরাসরি বলে বসেন, তারা খেলতে চান, তাহলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। তখন সরকারও বলতে পারে, খেলোয়াড়দের ইচ্ছেকেই সম্মান জানানো হয়েছে। দায়িত্বটা কার্যত ক্রিকেটারদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে।
এই জায়গাটা খুব স্পর্শকাতর। একদিকে দেশের সম্মান, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অবস্থান। অন্যদিকে বিশ্বকাপ মিস করার ভয়, যা একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারে বড় ধাক্কা হতে পারে।
ভাবুন তো, চার বছর পরপর আসা একটা বিশ্বকাপ। ফর্মে থাকা ক্রিকেটাররা যদি শুধু ভেন্যু বিতর্কের কারণে খেলতেই না পারেন, সেটা কতটা হতাশার।
সব মিলিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, শেষ মুহূর্তে কি বাংলাদেশ অবস্থান বদলাবে? ইতিহাস বলছে, ক্রিকেটে শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত নতুন কিছু নয়। বাস্তব চাপ, আইসিসির কড়া অবস্থান এবং বিকল্প হিসেবে স্কটল্যান্ডকে নেওয়ার হুমকি—সব মিলিয়ে বিসিবির সামনে রাস্তা খুব বেশি খোলা নেই।
ভারতে খেলতে রাজি হলে সমালোচনা আসবে। না খেললে বিশ্বকাপটাই যাবে হাতছাড়া। দুই দিকেই ঝুঁকি। এই মুহূর্তে বিসিবি সময় নিচ্ছে, কথা বলছে, হিসেব কষছে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ভারতে খেলুক বা না খেলুক, এই পুরো ঘটনায় দেশের ক্রিকেট যে বড় ধাক্কা খেয়েছে, সেটা অস্বীকার করা যাবে না। আন্তর্জাতিক মহলে একঘরে হওয়ার ছবি স্পষ্ট। বোর্ডের কূটনৈতিক দুর্বলতাও প্রকাশ্যে এসেছে।
এখন শুধু অপেক্ষা। বৃহস্পতিবার কী ঘোষণা আসে, সেটার দিকে তাকিয়ে পুরো ক্রিকেট বিশ্ব। আর বাংলাদেশের ক্রিকেটভক্তরা ভাবছেন একটাই কথা—এই বিশ্বকাপ কি সত্যিই দেখা হবে লাল-সবুজের জার্সিতে, নাকি সব শেষ হয়ে যাবে টেবিলের কাগজেই।


