সুপার এইট মানেই আসল পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষার মঞ্চ যদি হয় আহমেদাবাদের বিশাল স্টেডিয়াম, তাহলে উত্তেজনা একটু বেশি হবেই। গ্রুপ পর্বে সব ম্যাচে আগে ব্যাট করে জিতেছিল ভারত। কিন্তু এবার গল্পটা অন্যরকম। প্রথমবার রান তাড়া করতে নামতে হবে। তাও শক্তিশালী দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে।
শুরুর দিকে মনে হচ্ছিল ম্যাচ পুরোপুরি ভারতের মুঠোয়। কিন্তু ক্রিকেট যে কত দ্রুত মোড় নেয়, সেটা আবার দেখিয়ে দিলেন ডেভিড মিলার। ‘কিলার মিলার’ নামটা যে এমনি এমনি নয়, সেটা আরেকবার প্রমাণ করলেন তিনি।
আহমেদাবাদের এই মাঠে সাধারণত রান বন্যা দেখা যায়। উইকেট সমতল। বল ব্যাটে ভালো আসে। উপরন্তু রাতে শিশির বড় ফ্যাক্টর। তাই টস জিতে অনেক দলই পরে বল করতে চায়।
কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক আইডেন মার্করাম টস জিতে আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিলেন। অনেকেই অবাক। কারণ এই মাঠে রান তাড়া করাই তুলনামূলক সহজ ধরা হয়। তবে মার্করাম বুঝেছিলেন, বড় স্কোর বোর্ডে তুলে চাপ তৈরি করাই হবে তাদের মূল অস্ত্র।
ভারতের হয়ে শুরুটা ছিল একেবারে স্বপ্নের মতো। জশপ্রীত বুমরাহ প্রথম ওভার থেকেই আগ্রাসী। দ্বিতীয় ওভারেই কুইন্টন ডি’ককের উইকেট উড়িয়ে দিলেন। বলের গতি আর লাইন এমন ছিল, ব্যাটসম্যান বুঝে ওঠার আগেই স্টাম্প উড়ে গেল।
তারপরের ওভারেই আঘাত হানলেন অর্শদীপ সিং। ফিরলেন মার্করাম। যেন ঝড়ের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার টপ অর্ডার ভেঙে পড়ল।
চার ওভারে ২০ রান, তিন উইকেট। এই অবস্থায় আপনি যদি টিভির সামনে বসে থাকেন, নিশ্চয়ই ভাবছিলেন ম্যাচ একেবারে ভারতের পকেটে।
বুমরাহ থামেননি। রায়ান রিকেলটনকেও ফেরালেন চমৎকার ভ্যারিয়েশনে। বল কখন দ্রুত, কখন ধীর—এই মিশ্রণে ব্যাটসম্যানরা বিভ্রান্ত।
কিন্তু ক্রিকেটে একটা জিনিস খুব গুরুত্বপূর্ণ—ধৈর্য। টপ অর্ডার ভেঙে গেলেও দক্ষিণ আফ্রিকা আতঙ্কিত হয়নি। পাওয়ার প্লে শেষ হওয়া পর্যন্ত সময় নিল। তারপর শুরু হল আসল আক্রমণ।
ডেভিড মিলার ক্রিজে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে ইনিংস গড়লেন। তারপর সুযোগ পেলেই বড় শট। শিবম দুবের ওভারে লাইন-লেংথ একটু এদিক-ওদিক হতেই মিলার নির্দয়। কভার ড্রাইভ, পুল, লং-অন দিয়ে ছক্কা—সব বেরিয়ে এল একে একে।
তার সঙ্গে যোগ দিলেন ডেওয়াল্ড ব্রেভিস। তরুণ হলেও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। দুজনে মিলে ম্যাচের গতি ঘুরিয়ে দিলেন। মনে হচ্ছিল একসময় যে দল চাপে ছিল, তারাই এখন নিয়ন্ত্রণে।
মিলার ৩৫ বলে ৬৩ রান করেন। ইনিংসটা ছিল হিসেবি অথচ আক্রমণাত্মক। ব্রেভিসও গুরুত্বপূর্ণ ৪৫ রান যোগ করেন। এই জুটিই দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসকে মজবুত ভিত দেয়।
ভারতের স্পিন বিভাগ সেই ছাপ ফেলতে পারেনি। বরুণ চক্রবর্তী তার চার ওভারে ৪৭ রান দেন। এই মাঠে সাদামাটা বোলিং মানেই শাস্তি। ব্যাটসম্যানরা সুযোগ হাতছাড়া করেনি।
তবে আবার দৃশ্যপটে বুমরাহ। যেন সিনেমার নায়ক শেষ দৃশ্যে ফিরে আসে। একের পর এক ইয়র্কার। ত্রিস্তান স্টাবসদের শট খেলার সুযোগই দিলেন না। করবিন বশকে নিখুঁত ইয়র্কারে ফেরালেন।
এই ম্যাচে বুমরাহর ৩ উইকেট শুধু দলের জন্য নয়, ব্যক্তিগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের হয়ে সর্বাধিক উইকেট নেওয়ার রেকর্ড এখন তার দখলে।
অর্শদীপও শেষদিকে দারুণ সাপোর্ট দেন। সুইংয়ে বিপাকে ফেলেন মার্কো জানসেনকে।
সব কিছু ঠিকঠাক এগোচ্ছিল। কিন্তু শেষ ওভারেই ম্যাচের রং বদলে যায়। হার্দিক পান্ডিয়া ২০ রান দিয়ে ফেলেন। এই ওভারটাই পার্থক্য গড়ে দেয়।
ত্রিস্তান স্টাবস ২৪ বলে ৪৪ রান করে ইনিংস শেষটা ঝড়ের মতো করেন। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর গিয়ে দাঁড়ায় ১৮৭।
ভাবুন তো, যদি শেষ ওভারে ৮-১০ রান হত, তাহলে চিত্রটা অন্যরকম হতে পারত। টি-টোয়েন্টিতে ছোট ছোট মুহূর্তই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে।
এই মাঠে ১৮৮ খুব অস্বাভাবিক স্কোর নয়। ব্যাটিং সহায়ক পিচে ভালো শুরু পেলে এই রান তোলা সম্ভব। তবে চাপটা থাকবে। কারণ সুপার এইট মানেই নকআউটের মতো মানসিক লড়াই।
ভারতের টপ অর্ডারকে দায়িত্ব নিতে হবে। পাওয়ার প্লে কাজে লাগাতে হবে। মিডল অর্ডারকে ঠান্ডা মাথায় খেলতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, উইকেট হাতে রাখতে হবে।
মনে করুন আপনি ১৮৮ রান তাড়া করছেন। শুরুতে দুটো উইকেট পড়ে গেলে কী হবে? তখনই দরকার অভিজ্ঞতা আর আত্মবিশ্বাস।
এই ম্যাচ শুধু রান তাড়ার লড়াই নয়। এটা মানসিক শক্তিরও পরীক্ষা। দক্ষিণ আফ্রিকা লড়াই করে স্কোর তুলেছে। এবার দেখার, ভারত সেই চ্যালেঞ্জ কতটা দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করে।
ক্রিকেটের মজা এখানেই। এক মুহূর্তে সব কিছু বদলে যায়। আর সেই অনিশ্চয়তাই আমাদের টিভির সামনে আটকে রাখে শেষ বল পর্যন্ত।


