টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই আলাদা উত্তেজনা। মাঠে শুধু ক্রিকেট খেলা হয় না, সেখানে জড়িয়ে থাকে আবেগ, সম্মান আর দেশের জন্য কিছু করে দেখানোর ইচ্ছা। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই নিজের ব্যাটকে অস্ত্র বানিয়ে সবাইকে চমকে দিলেন ঈশান কিষান। এক সময় যাঁর নামের পাশে ‘অবাধ্য’ বা ‘উচ্ছৃঙ্খল’ তকমা জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই তিনিই আজ হয়ে উঠলেন ম্যাচের নায়ক।
এই ইনিংস শুধু রান তোলার গল্প নয়। এটা ফিরে আসার গল্প, লড়াইয়ের গল্প, আর নিজের দেশের জন্য সবটুকু দিয়ে খেলার গল্প।
ক্রিকেটারদের জীবন সব সময় সহজ হয় না। কখনও ভালো খেলেও দল থেকে বাদ পড়তে হয়, কখনও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। ঈশান কিষানের ক্ষেত্রেও এমনটা হয়েছিল। ২০২২ সালে ডবল সেঞ্চুরি করার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি ভারতীয় দলে স্থায়ী জায়গা করে ফেলেছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই দল থেকে বাদ পড়তে হয় তাঁকে।
সেই সময়টা সহজ ছিল না। চারপাশে প্রশ্ন, সমালোচনা, সন্দেহ—সবই ছিল। তবু তিনি থামেননি। ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত রান করে আবার নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। যেন মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলেন, একদিন বড় মঞ্চেই জবাব দেবেন।
এই মানসিক শক্তির পেছনে ছিল তাঁর আস্থা আর বিশ্বাস। ভগবদ্গীতা তাঁর জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। বাবার কাছ থেকে শ্লোকের মানে বুঝে ধীরে ধীরে সেই শিক্ষা তাঁকে শক্তি দেয়। মাঠে নামার সময় ব্যাট আর গ্লাভসের পাশাপাশি গীতার বাণীও যেন তাঁকে সাহস জুগিয়েছে।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে শুরুটা একদম মসৃণ ছিল না। প্রথম উইকেট দ্রুত পড়ে যাওয়ায় একটু চাপ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তখনই দায়িত্ব তুলে নেন ঈশান। যেন মনে মনে বলেছিলেন, “এখান থেকে আমি সামলে নেব।”
পাকিস্তানের বোলাররা একের পর এক বল করছেন, আর তিনি সেই বলগুলো মাঠের বিভিন্ন দিকে পাঠাচ্ছেন। বিশেষ করে শাদাব খান ও শাহিন আফ্রিদি-র মতো বোলারদের সামলে যেভাবে রান তুলেছেন, তা দেখার মতো ছিল।
মাত্র ২৭ বলে হাফসেঞ্চুরি। এই গতি যে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেবে, সেটা তখনই বোঝা যাচ্ছিল। চারদিকে তখন শুধু উচ্ছ্বাস। দর্শকেরা অপেক্ষা করছিলেন, এবার বলটা কোন দিকে যাবে।
শেষ পর্যন্ত ৪০ বলে ৭৭ রান করেন তিনি। ১০টি চার আর ৩টি ছক্কা—এই ইনিংসেই ম্যাচের ভিত শক্ত করে দেন। যখন সাইম আয়ুব-এর বলে আউট হন, তখন ভারতের ইনিংস অনেকটাই নিরাপদ জায়গায় দাঁড়িয়ে গেছে।
ম্যাচ শেষে তাঁর কথাতেই বোঝা গেল, এই ইনিংস তাঁর কাছে কতটা বিশেষ। তিনি বললেন, এই জয় শুধু দলের জন্য নয়, দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
এমন ম্যাচে খেলতে নামলে খেলোয়াড়দের মনে আলাদা একটা অনুভূতি কাজ করে। শুধু নিজের জন্য নয়, কোটি মানুষের আশা-ভরসার কথা মাথায় থাকে। সেই চাপকে সামলে যেভাবে তিনি খেলেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের দলে বেশ কয়েকজন ভালো স্পিনার আছে। তাঁদের বিরুদ্ধে এই জয় দলের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়াবে। সামনে আরও ম্যাচ আছে, সেখানে এই আত্মবিশ্বাস কাজে লাগবে।
ক্রিকেট কখনও একার খেলা নয়। একটা দল জিততে গেলে সবাইকে একসঙ্গে পারফর্ম করতে হয়। ঈশান নিজের ইনিংসের কথা বললেও সতীর্থদের অবদান ভুলে যাননি।
বিশেষ করে জসপ্রীত বুমরাহ ও হার্দিক পাণ্ডিয়া-র পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেন তিনি। বোলিংয়ে ওরা যেভাবে চাপ তৈরি করেছেন, সেটাও ম্যাচ জেতার বড় কারণ।
অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব-ও একই কথা বলেন। তাঁর মতে, এই জয় শুধু একটা ম্যাচ জেতা নয়, এটা পুরো দেশের জন্য গর্বের মুহূর্ত।
এক সময় অনেকেই বলেছিলেন, ঈশান নাকি শৃঙ্খল মানেন না। নানা রকম কথা ছড়িয়েছিল। কিন্তু তিনি কারও সঙ্গে তর্কে যাননি। মাঠেই জবাব দিয়েছেন।
জীবনে এমন সময় সবারই আসে, যখন চারপাশে কেউ বিশ্বাস করে না। তখন নিজের ওপর বিশ্বাসটাই সবচেয়ে বড় শক্তি হয়। ঈশানের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করেছেন, ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছেন। এই ইনিংস যেন তাঁর সেই ধৈর্যের পুরস্কার।
ভারত আর পাকিস্তান-এর ম্যাচ সব সময়ই বিশেষ। এখানে ছোট ভুলও বড় হয়ে যায়, আর একটা ভালো ইনিংসই হয়ে ওঠে ইতিহাস।
এই ম্যাচে ভারত-এর জন্য ঈশানের ৭৭ রান ঠিক তেমনই একটা ইনিংস। শুধু স্কোরবোর্ডে রান বাড়ানো নয়, দলের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মাঠে তাঁর শরীরী ভাষা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তিনি খুব মন দিয়ে খেলছেন। প্রতিটা শট ছিল পরিকল্পনা করে মারা। কখন আক্রমণ করতে হবে, কখন শান্ত থাকতে হবে—সবকিছুই যেন ঠিকঠাক মিলিয়ে গেছে।
অনেকেই হয়তো ভাবেন, একজন খেলোয়াড়ের জীবনে ধর্মগ্রন্থ বা আধ্যাত্মিকতার জায়গা কোথায়। কিন্তু ঈশানের গল্পটা একটু আলাদা।
তিনি নিজেই বলেছেন, গীতার বাণী তাঁকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে সাহায্য করেছে। খারাপ সময়েও হাল না ছাড়তে শিখিয়েছে। এটা অনেকটা এমন, যেমন কেউ কঠিন সময় পার করতে গিয়ে প্রিয় কোনও কথায় ভরসা খুঁজে পায়।
মাঠে নামার আগে সেই বিশ্বাসটাই তাঁকে শান্ত রাখে। আর হয়তো সেই কারণেই বড় মঞ্চেও নিজেকে হারিয়ে ফেলেন না।
এই ইনিংস শুধু একটা ম্যাচ জেতানোর গল্প নয়। এটা একটা নতুন শুরুর ইঙ্গিতও। এতদিন যে জায়গাটা অনিশ্চিত ছিল, এখন মনে হচ্ছে তিনি আবার নিজের জায়গা শক্ত করে ফেলেছেন।
দলের জন্য, নিজের জন্য আর দেশের জন্য—এই তিনটার মিলেই যেন তাঁর ব্যাট কথা বলেছে। সামনে আরও ম্যাচ আছে। কিন্তু এই ম্যাচটা হয়তো তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
একজন ক্রিকেটারের জীবনে এমন কিছু ইনিংস থাকে, যা সবকিছু বদলে দেয়। ঈশান কিষানের এই ৭৭ রান ঠিক তেমনই একটা ইনিংস। যেখানে সমালোচনার জবাব আছে, আত্মবিশ্বাসের গল্প আছে, আর সবচেয়ে বড় কথা—দেশের জন্য কিছু করে দেখানোর তৃপ্তি আছে।


