একটা সময় ছিল, নামটাই যথেষ্ট ছিল—অস্ট্রেলিয়া। মাঠে নামলেই প্রতিপক্ষের বুক কাঁপত। বিশ্বক্রিকেটে তারা ছিল দাপটের আরেক নাম। কিন্তু সময় বদলায়। আর সেই বদলটাই যেন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে অজি ব্রিগেড।
২০২৩ সালে ICC Cricket World Cup জিতে ভারতীয় সমর্থকদের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। ফাইনালে তাদের পারফরম্যান্স ছিল নিখুঁত, আত্মবিশ্বাসে টগবগে। কিন্তু ট্রফি জয়ের পর যে ছবি ভাইরাল হয়েছিল, সেটাই যেন আজও তাড়া করে ফিরছে দলটাকে। বিশ্বকাপ ট্রফির উপর পা তুলে বসে বিয়ার হাতে উল্লাস করছিলেন Mitchell Marsh। অনেকেই তখন সেটা ‘উচ্ছ্বাস’ বলেছিলেন, আবার কেউ দেখেছিলেন ‘অহংকার’।
দুই বছর ঘুরতেই ছবিটা একেবারে উল্টো।
২০২৩ সালের ঐতিহাসিক জয়ের পর ধারাবাহিকভাবে বড় টুর্নামেন্ট খেলেছে অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ফল? আশানুরূপ নয়, বরং হতাশাজনক। পরপর দুইটি টি-২০ বিশ্বকাপে তারা সেমিফাইনালের মুখই দেখতে পারেনি। ২০২৪ বিশ্বকাপে সুপার এইটে উঠলেও ভারতের কাছে হেরে থেমে যায় তাদের যাত্রা।
আর চলতি বিশ্বকাপে তো অবস্থা আরও করুণ। গ্রুপ পর্বই পেরোতে পারেনি তারা। এক ম্যাচ বাকি থাকতেই শেষ হয়ে গেছে বিশ্বকাপের স্বপ্ন। এমনকি জিম্বাবোয়ের মতো তুলনামূলক দুর্বল দলের কাছেও হারতে হয়েছে অজিদের। যে দল একসময় প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাত, আজ সেই দলই অপ্রত্যাশিত হারের তালিকায় নাম লেখাচ্ছে।
ভাবো তো, যে দলকে সবাই ফেভারিট ধরে নেয়, তারা যদি গ্রুপ থেকেই ছিটকে যায়—কতটা ধাক্কা লাগে সমর্থকদের!
২০২৫ সালে ICC Champions Trophy জয়ের স্বপ্ন নিয়েও মাঠে নেমেছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু সেমিফাইনালে ভারতের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়। বড় ম্যাচে চাপে ভেঙে পড়ার প্রবণতা যেন বেড়েই চলেছে।
এছাড়া গত বছর ICC World Test Championship Final-এ ফাইনালে উঠেছিল Pat Cummins-এর দল। টেস্ট ক্রিকেটে আবারও বিশ্বসেরার তকমা পাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হার মানতে হয়। স্বপ্নভঙ্গ সেখানেও।
একসময় অস্ট্রেলিয়া মানেই ছিল ধারাবাহিক সাফল্য। এখন তারা যেন বড় মঞ্চে এসে হোঁচট খাচ্ছে।
শুধু পুরুষ দল নয়, একই ছবি দেখা যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার মহিলা ক্রিকেটেও। গত বছর মহিলা বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে একটিও ম্যাচ না হেরে সেমিফাইনালে উঠেছিল দলটি। নেতৃত্বে ছিলেন Alyssa Healy। কিন্তু সেমিফাইনালে ভারতের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়।
অর্থাৎ, অস্ট্রেলিয়া এখন আর অজেয় নয়—পুরুষ হোক বা মহিলা, দুই বিভাগেই বড় ম্যাচে ধাক্কা খাচ্ছে তারা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন একটা কথাই ঘুরছে—সবই নাকি “পাপের ফল”! বিশ্বকাপ ট্রফির মতো সম্মানিত জিনিসের উপর পা তুলে বসা, সঙ্গে মদ্যপান—এই দৃশ্য অনেক সমর্থকের চোখে লেগেছিল অসম্মানের মতো। ক্রিকেটপ্রেমীরা বলছেন, ক্রিকেট দেবতা নাকি সেটা ভালোভাবে নেননি।
অনেকে সরাসরি বলছেন, অস্ট্রেলিয়ার পতনের মূল কারণ অহংকার। ট্রফি জয়ের পর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, ঔদ্ধত্য—এসবই নাকি দলের ফোকাস নষ্ট করেছে। একটা সময় তারা ছিল ক্ষুধার্ত দল, জিততে মরিয়া। এখন সেই আগ্রাসন আছে, কিন্তু বিনয় কমে গেছে—এমন অভিযোগও উঠছে।
অবশ্য বাস্তব ছবিটা হয়তো একটু জটিল। ফর্মের ওঠানামা, দলগঠনের সমস্যা, ইনজুরি, নতুন খেলোয়াড়দের মানিয়ে নেওয়া—সব মিলিয়েই এই ছন্দপতন। কিন্তু ভক্তদের আবেগ তো যুক্তির ধার ধারে না। তারা সহজ ব্যাখ্যাই খোঁজে—“অহংকারের শাস্তি”।
২০২৩ সালের ফাইনালের ক্ষত এখনো অনেক ভারতীয় সমর্থকের মনে টাটকা। তাই অস্ট্রেলিয়ার গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার খবরে অনেকেই খুশি হয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যঙ্গ, মিম, মন্তব্য—সব মিলিয়ে একপ্রকার উৎসবই চলছে।
ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবেই। জিতলে উল্লাস, হারলে সমালোচনা—এটাই স্বাভাবিক। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট, অস্ট্রেলিয়ার পতন বিশ্বক্রিকেটে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
অস্ট্রেলিয়া এখনও শক্তিশালী দল। তাদের ক্রিকেট কাঠামো মজবুত, ঘরোয়া লিগ শক্তিশালী, তরুণ প্রতিভার অভাব নেই। তাই এই খারাপ সময় কাটিয়ে তারা ঘুরে দাঁড়াতেই পারে। ইতিহাস বলছে, অজিরা বারবার ধাক্কা খেয়েও আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরেছে।
তবে একটা শিক্ষা হয়তো তারা নিয়েছে—জয় যেমন মুহূর্তের, তেমনি পতনও হঠাৎ আসে। মাঠের পারফরম্যান্সই শেষ কথা বলে। ট্রফি জয়ের উল্লাস যত বড়ই হোক, সেটার মর্যাদা রক্ষা করাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আজ যে দলকে দেখে অনেকে বলছে “অসহায়”, কাল সেই দলই আবার ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। ক্রিকেট এমনই খেলা—এখানে চিরকাল কেউ রাজা থাকে না।
অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ ব্যর্থতা তাই শুধু এক দলের পতনের গল্প নয়। এটা স্মরণ করিয়ে দেয়, সাফল্যের পর বিনয় হারালে সমালোচনার ঝড় বইবেই। আর মাঠে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স না থাকলে, অতীতের গৌরব দিয়ে বর্তমান বাঁচানো যায় না।
এখন দেখার, অজি ব্রিগেড এই সমালোচনাকে প্রেরণায় বদলে আবারও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করতে পারে কি না। কারণ ক্রিকেট ইতিহাস বলছে—অস্ট্রেলিয়াকে কখনও পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া যায় না।



