বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তাদের অবস্থানে একচুলও নড়েনি। বহুদিনের টানাপোড়েন, আলোচনা আর জল্পনার পর বিসিবি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ভারতে বসে বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ দল যাবে না। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত নয়। এটি এখন রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
অনেকে বলছেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। আবার বিসিবি ও সরকারের দাবি, বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না খেললে আসল ক্ষতির মুখে পড়বে ভারত ও আইসিসি। কারণ হিসেবে সামনে আনা হয়েছে একটি বড় সংখ্যা—২০ কোটি দর্শক।
বাংলাদেশ এখন আর ছোট কোনো ক্রিকেট দেশ নয়। ঘরের মাঠ হোক বা বিদেশ, বাংলাদেশের ম্যাচ মানেই বিপুল দর্শক। টিভির সামনে বসে থাকা কোটি কোটি মানুষ, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়, স্পনসরদের আগ্রহ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি বড় বাজার।
এই জায়গা থেকেই বিসিবি বলছে, বাংলাদেশ না খেললে বিশ্বকাপের আবেদন অনেকটাই কমে যাবে। দর্শক কমবে, বিজ্ঞাপন কমবে, সম্প্রচারের মূল্যও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সহজ কথায়, টাকা কম আসবে।
বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল খুব পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, অর্থ নয়, সবার আগে নিরাপত্তা। তাঁর মতে, ক্রিকেটার, সমর্থক, এমনকি সংবাদমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রেখে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
তিনি বলেছেন, যে দেশে গিয়ে খেলতে হলে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থাকে, সেখানে খেলোয়াড় পাঠানো দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ। কোন দেশে দল যাবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সরকারের। আর সরকার ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ যাবে না।
এই বক্তব্যে স্পষ্ট, এখানে বিসিবির চেয়েও সরকারের ভূমিকা বড়।
বুধবারের বৈঠকে আইসিসি নাকি একেবারে সাফ কথা বলে দিয়েছে। যদি বাংলাদেশ ভারতে এসে বিশ্বকাপ খেলতে রাজি না হয়, তাহলে এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাদের জায়গা হবে না। সেই জায়গায় অন্য কোনো দেশকে সুযোগ দেওয়া হবে।
এই হুমকি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতির কঠোর বাস্তবতা তুলে ধরে। আইসিসি দেখাতে চাইছে, তারা আয়োজক দেশ ও নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড়।
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম কিন্তু একেবারেই নরম হননি। তাঁর বক্তব্যে আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে বাদ দিলে আইসিসিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ এতে তারা ২০ কোটি দর্শক হারাবে।
তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে আমরা গর্ব করি। কিন্তু বিশ্ব ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বকাপ মানেই বড় একটি শূন্যতা। আইসিসি নিশ্চয়ই এত বড় ঝুঁকি নেবে না।
এই কথার ভেতরে একটি চাপের কৌশল আছে। বিসিবি বোঝাতে চাইছে, দর্শকই আসল শক্তি।
ভাবুন তো, বাংলাদেশ নেই এমন একটি বিশ্বকাপ। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হবে, অস্ট্রেলিয়া খেলবে, ইংল্যান্ডও থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল একটি অংশ তখন আগ্রহ হারাতে পারে।
বাংলাদেশের ম্যাচ মানেই আবেগ, উত্তেজনা, নাটক। অনেক নিরপেক্ষ দর্শকও বাংলাদেশ ম্যাচ দেখতে বসে যায়। এই বাস্তবতাই বিসিবির সবচেয়ে বড় যুক্তি।
আমিনুল ইসলাম আরও বড় ছবির কথা বলেছেন। ক্রিকেট ২০২৮ অলিম্পিকে যাচ্ছে। ২০৩২ সালে ব্রিসবেন অলিম্পিক আয়োজন করবে। ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের জন্য ভারত বিড করতে পারে, সঙ্গে থাকবে কমনওয়েলথ গেমস।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়া মানে শুধু একটি বিশ্বকাপ নয়, ভবিষ্যতের ক্রিকেট বাজারকেও দুর্বল করা। একটি ক্রিকেটপ্রেমী দেশকে বাইরে রাখলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশ একটাই দাবি তুলে ধরেছে। তারা বিশ্বকাপ খেলতে চায়, কিন্তু ভারতে নয়। বিকল্প হিসেবে শ্রীলঙ্কার নাম এসেছে।
শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটপ্রেমী দেশ, ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি, এবং নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের আপত্তিও তুলনামূলক কম। বিসিবি মনে করছে, এখানে সমাধানের সুযোগ আছে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
এই পুরো ঘটনায় একটি বিষয় পরিষ্কার। ক্রিকেট এখন আর শুধু মাঠের খেলা নয়। এটি রাজনীতি, কূটনীতি, নিরাপত্তা আর বিশাল অর্থনীতির অংশ।
বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থান ধরে রেখে দেখাতে চাইছে, তারা শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, তারা একটি শক্তিশালী ক্রিকেট বাজার। অন্যদিকে আইসিসি ও ভারত দেখাতে চাইছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনো তাদের হাতেই।
বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে কি খেলবে না, সেটার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি। কিন্তু যে কথাটা নিশ্চিত, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু বাংলাদেশ ক্রিকেটে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ঢেউ পড়বে পুরো বিশ্ব ক্রিকেটে।
২০ কোটি দর্শক কি সত্যিই আইসিসিকে পিছু হটাতে পারবে, নাকি আইসিসি কঠোর অবস্থানেই থাকবে—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়। আপাতত সবাই তাকিয়ে আছে শেষ মুহূর্তের নাটকের দিকে।


