ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য আরেকটি রোমাঞ্চকর লড়াই অপেক্ষা করছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি মাঠে নামছে ভারত ও নেদারল্যান্ডস। চলতি ICC T20I World Cup 2026-এর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হবে দুই দল। কাগজে-কলমে ফেভারিট অবশ্যই India national cricket team। কিন্তু অবাক করার মতো কথা হলো, ডাচ শিবিরে কোনও ভয় বা চাপের ছাপ নেই। বরং তারা অপেক্ষা করছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে খেলার বিরল অভিজ্ঞতার জন্য।
এই ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে Narendra Modi Stadium। প্রায় ১.৩২ লাখ দর্শক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই স্টেডিয়াম ক্রিকেট দুনিয়ার গর্ব। ডাচ খেলোয়াড়দের কাছে এখানে নামাটাই যেন এক স্বপ্নপূরণ।
নেদারল্যান্ডস ক্রিকেট দলের মিডিয়া ও মার্কেটিং ম্যানেজার জন ভ্যান ব্লিয়েট জানালেন, ভারতের মতো দেশে ক্রিকেট মানেই আবেগ। তিনি মনে করেন, এত বিশাল গ্যালারির সামনে খেলতে পারাটাই তাদের জন্য বিশাল সুযোগ। এমনকি স্টেডিয়াম অর্ধেক ভরলেও সেটি ডাচদের কাছে অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা।
তুমি একবার ভাবো, নিজের দেশে সাধারণত যেখানে কয়েক হাজার দর্শকের সামনে খেলা হয়, সেখানে হঠাৎ লক্ষাধিক মানুষের সামনে মাঠে নামা—কী রকম অনুভূতি হতে পারে! ফুটবল বিশ্বকাপে তারা বড় সমর্থন দেখেছে ঠিকই, কিন্তু ক্রিকেটে এমন পরিবেশ তাদের কাছে নতুন।
এই ম্যাচে ভারত যে এগিয়ে, তা নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। সাম্প্রতিক ফর্ম, অভিজ্ঞতা, ঘরের মাঠ—সবকিছুই ভারতের পক্ষে। তবু নেদারল্যান্ডস নিজেদের ছোট ভাবছে না। তারা জানে, বড় দলের বিরুদ্ধে ভালো খেলাই তাদের আসল অর্জন।
ডাচ শিবিরের ভাবনা পরিষ্কার—হারানোর কিছু নেই, পাওয়ার আছে অনেক কিছু। বড় দলের বিরুদ্ধে ভালো পারফরম্যান্স মানে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা। অনেক সময় আন্ডারডগ দলগুলোই সবচেয়ে সাহসী ক্রিকেট খেলতে পারে, কারণ তাদের ওপর প্রত্যাশার চাপ কম থাকে।
নেদারল্যান্ডসের অধিনায়ক Scott Edwards পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, এই ম্যাচ তাদের জন্য শেখার সুযোগ। বিশ্বের বৃহত্তম স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে খেলা—এটাই বড় প্রাপ্তি।
তিনি বলেন, এমন ম্যাচে নিজেদের দক্ষতা যাচাই করার সুযোগ মিলবে। ভারতের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে লড়াই করেই বোঝা যায় দল কোথায় দাঁড়িয়ে। এডওয়ার্ডসের কথায় কোনও বাড়তি নাটকীয়তা নেই, বরং রয়েছে বাস্তববাদী আত্মবিশ্বাস।
তুমি যদি নতুন কোনও কাজে ঝাঁপাও, আর সেটা যদি সেরাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা হয়—ভয় পাবে, না কি উত্তেজিত হবে? ডাচ অধিনায়ক দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিয়েছেন।
নেদারল্যান্ডস মূলত ফুটবলনির্ভর দেশ। ক্রিকেট এখনও সেখানে প্রান্তিক খেলা। ছোট পরিসরে খেলাটি টিকে আছে, কিন্তু জনপ্রিয়তার দিক থেকে ফুটবলের ধারেকাছেও নয়।
তবু গত কয়েক বছরে আইসিসি ইভেন্টে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে ডাচরা প্রমাণ করেছে, তারা হারিয়ে যায়নি। ধীরে ধীরে ক্রিকেট কাঠামো মজবুত করার চেষ্টা চলছে। বড় মঞ্চে ভালো পারফরম্যান্স পেলে স্পনসর, বিনিয়োগ এবং তরুণদের আগ্রহ—সবই বাড়বে।
এই ম্যাচ তাই শুধু একটি গ্রুপ পর্বের লড়াই নয়। এটি ডাচ ক্রিকেটের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
ডাচ শিবিরের আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে ভালো খেলা মানে দুই দেশের মধ্যে ক্রিকেটভিত্তিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা। ভারতীয় বাজার বিশাল। এখানে দৃশ্যমানতা বাড়লে স্পনসরশিপের দরজা খুলতে পারে।
ভাবো তো, এক ম্যাচে যদি লক্ষাধিক দর্শক আর কোটি কোটি টিভি দর্শকের নজরে পড়া যায়, সেটা কত বড় সুযোগ! তাই তারা এই ম্যাচকে কেবল ক্রীড়া লড়াই হিসেবে দেখছে না, বরং সম্ভাবনার দরজা হিসেবেও দেখছে।
ভারতের লক্ষ্য পরিষ্কার—গ্রুপ পর্ব শেষ করা জয় দিয়ে। বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী দলগুলো সাধারণত ছোট দলের বিরুদ্ধে কোনও ঝুঁকি নেয় না। তাই ভারতও চাইবে নির্ভুল ক্রিকেট খেলতে।
তবে ক্রিকেটের সৌন্দর্যই হলো অনিশ্চয়তা। কাগজে-কলমে শক্তিশালী দল সবসময় জেতে না। এক-দুটি ভালো স্পেল, একটি দারুণ ইনিংস—ম্যাচের চেহারা বদলে দিতে পারে।
১.৩২ লাখ দর্শকের সামনে খেলা মানে শুধু ক্রিকেট দক্ষতা নয়, মানসিক দৃঢ়তারও পরীক্ষা। শব্দ, চিৎকার, চাপ—সব মিলিয়ে পরিবেশটা আলাদা। যারা এমন পরিস্থিতিতে আগে খেলেনি, তাদের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু অনেক সময় এই পরিবেশই খেলোয়াড়দের সেরা পারফরম্যান্স বের করে আনে। বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদ আলাদা রকম শক্তি দেয়।
একদিকে ভারত, যাদের ইতিহাস, শক্তি ও সাফল্য বিশ্বজোড়া। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডস, যারা ধীরে ধীরে নিজেদের জায়গা তৈরি করছে। দুই দলের অবস্থান ভিন্ন হলেও মাঠে নামার পর সবার লক্ষ্য একটাই—ভালো ক্রিকেট খেলা।
ডাচ অধিনায়কের কথায় বোঝা যায়, তারা ভারতের নাম শুনে পিছিয়ে যেতে রাজি নয়। বরং তারা এটিকে সুযোগ হিসেবে দেখছে। বড় দলের বিরুদ্ধে লড়াই করেই তো নিজেদের উন্নতি মাপা যায়।
এই ম্যাচ হয়তো টুর্নামেন্টের হিসেব খুব একটা বদলাবে না। কিন্তু অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনার দিক থেকে এটি নেদারল্যান্ডসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর ভারতের জন্য এটি নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের আরেকটি মঞ্চ।
ক্রিকেটে অনেক সময় ছোট মুহূর্ত বড় গল্প তৈরি করে। দেখা যাক, মোতেরার গ্যালারি ভরা সেই রাতে কোন গল্পটি লেখা হয়—ফেভারিটের স্বাভাবিক জয়, না কি আন্ডারডগের চমক।
একটা কথা নিশ্চিত, Narendra Modi Stadium-এর গ্যালারিতে বসে যারা ম্যাচ দেখবেন, তারা একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতার অংশ হতে চলেছেন। আর ডাচ শিবির? তারা ভয় নয়, উপভোগ করতে প্রস্তুত।



