ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই আলাদা উত্তেজনা। এটা শুধু ক্রিকেট নয়, আবেগের লড়াই। আর যখন সেই লড়াই একপেশে হয়ে যায়, তখন আনন্দটা একটু বেশি হয়। সাম্প্রতিক মহারণে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের দাপুটে জয়ের পর সেই আনন্দই যেন নতুন মাত্রা পেল। কারণ মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুললেন ভারতের প্রাক্তন তারকা পেসার ইরফান পাঠান।
তিনি ‘আফগান জলেবি’ গানের তালে নেচে ভিডিও পোস্ট করতেই তা মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। আর ক্যাপশনে হালকা খোঁচা— “পড়োসিয়ো, সানডে ক্যায়সে রহা?” বুঝতেই পারছো, এই একটা লাইনেই আগুন লেগে গেছে নেটদুনিয়ায়।
গত কয়েক বছরে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ভারত বেশিরভাগ সময়েই আধিপত্য দেখিয়েছে। অনেকেই বলছেন, এই ম্যাচগুলো এখন আর আগের মতো হাড্ডাহাড্ডি লড়াই নয়। বরং ভারত অনেক সময়ই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখছে।
ভারতের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব একবার সরাসরি বলেছিলেন, এখন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে আগের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায় না। সাম্প্রতিক ম্যাচ সেই কথাকেই যেন আবার প্রমাণ করল। পাকিস্তান বড় বড় কথা বললেও বড় মঞ্চে বারবার হোঁচট খাচ্ছে।
ক্রিকেটে জয়-পরাজয় থাকবেই। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন দল জিতলে এমনভাবে জেতে, যাতে প্রতিপক্ষ দাঁড়ানোর সুযোগই পায় না। এই ম্যাচে ঠিক সেটাই হয়েছে। ভারত যেন শুরু থেকেই পাকিস্তানের ঘাড় চেপে ধরেছিল।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একটা নাচ এত ভাইরাল হলো কেন? কারণ এখানে শুধু নাচ নয়, আছে আবেগ, খোঁচা আর টাইমিং। ম্যাচ জেতার পরই ইরফান পাঠান ‘আফগান জলেবি’ গানে নেচে ভিডিও শেয়ার করেন। হাসিমুখ, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি—সব মিলিয়ে ভিডিওটা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে।
এই প্রথম নয়। এর আগেও এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়ের পর একইভাবে উদযাপন করেছিলেন তিনি। এমনকি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের স্মরণীয় জয়ের পরও এই গানেই নেচেছিলেন। ফলে ‘আফগান জলেবি’ যেন এখন ইরফানের সিগনেচার সেলিব্রেশন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ভারত-পাকিস্তান লড়াই বললেই একটাই ছবি ভেসে ওঠে—ভারতের ধারাবাহিক সাফল্য। একবার বাদ দিলে প্রায় সব ম্যাচেই ভারত জিতেছে। আর সেই হারগুলোর ধরনও নাটকীয়।
প্রথম টি-২০ বিশ্বকাপে বোল আউটের রোমাঞ্চ, ফাইনালে মিসবা উল হক-এর রিভার্স স্কুপ, ২০২২ সালে মেলবোর্নে বিরাট কোহলি-র ঐতিহাসিক ইনিংস—প্রতিটা ঘটনাই পাকিস্তান সমর্থকদের জন্য কষ্টের স্মৃতি। এমনকি সহজ লক্ষ্য তাড়া করতেও ব্যর্থ হওয়ার নজির আছে।
মনে হয় যেন ভারত ম্যাচে এগিয়ে থাকলে পাকিস্তান কোনো না কোনোভাবে হারের রাস্তা খুঁজে নেয়। এই মানসিক চাপটাই বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেয়।
ইরফান পাঠানের ভিডিও পোস্ট হতেই কমেন্ট সেকশন ভরে যায়। কেউ লিখেছেন, “বলেছিলাম না, ভারতই চ্যাম্পিয়ন।” কেউ আবার প্রশংসা করে লিখেছেন, “জিও শের!” আরেকজন মজা করে বলেছেন, “আপনি তো আবার প্রতিবেশীদের মির্চি লাগিয়ে দিলেন।”
এই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখেই বোঝা যায়, ক্রিকেট এখন শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ নেই। সোশ্যাল মিডিয়াই হয়ে উঠেছে দ্বিতীয় স্টেডিয়াম। এখানে ব্যাট-বল নয়, শব্দ আর ইমোজি দিয়ে লড়াই চলে।
ইরফান পাঠানের নাম উঠলেই একটা ঘটনা সবার আগে মনে পড়ে—২০০৬ সালে পাকিস্তানের মাটিতে টেস্ট ম্যাচে তাঁর হ্যাটট্রিক। সেই ম্যাচে শুরুতেই তিন উইকেট নিয়ে তিনি ইতিহাস গড়েছিলেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাঁর সেই সাফল্য আজও ভারতীয় সমর্থকদের মনে দাগ কেটে আছে।
তাই যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত বড় জয় পায়, আর সেই উদযাপনে ইরফান সামনে থাকেন, তখন আবেগটা অন্যরকম হয়। এটা যেন পুরনো হিসাবের আনন্দ।
ক্রিকেটে হার-জিত থাকবেই। কিন্তু ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে সেটা শুধু স্কোরবোর্ডে আটকে থাকে না। এখানে আত্মসম্মান, ইতিহাস আর সমর্থকদের আবেগ জড়িয়ে থাকে।
সাম্প্রতিক ম্যাচে ভারত যে আধিপত্য দেখিয়েছে, তা আবারও প্রমাণ করেছে—চাপের ম্যাচে মানসিক শক্তিই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। পাকিস্তানকে যদি আবার পুরনো ধারায় ফিরতে হয়, তাহলে শুধু প্রতিভা নয়, মানসিক দৃঢ়তাও বাড়াতে হবে।
আর ইরফান পাঠানের সেই নাচ? সেটা শুধু এক মুহূর্তের আনন্দ নয়। সেটা একটা বার্তা—জয়ের আনন্দ লুকিয়ে রাখার কিছু নেই। মাঠে জিতলে, উদযাপনও হবে দাপটের সঙ্গে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের উত্তেজনা এখনও তুঙ্গে। তবে ফলাফল যদি এভাবেই একপেশে হতে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এটা কি সত্যিই সমানে সমান লড়াই, নাকি একদল অন্য দলকে মানসিকভাবে হারিয়ে ফেলেছে?
একটা কথা নিশ্চিত, যতদিন এই দুই দল মুখোমুখি হবে, ততদিন আবেগ, খোঁচা, ভাইরাল ভিডিও আর স্মরণীয় মুহূর্তের অভাব হবে না। আর ‘আফগান জলেবি’ বাজলেই এখন থেকে অনেকের চোখে ভেসে উঠবে ইরফান পাঠানের সেই হাসিমুখ নাচ।


