ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ মানেই টানটান উত্তেজনা, আবেগ আর শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই। কিন্তু এবার ছবিটা একেবারেই অন্যরকম। যে ম্যাচকে ঘিরে এত আলোচনা, এত হিসাব–নিকাশ, সেটাই শেষ পর্যন্ত হয়ে গেল একপেশে। ভারত ৬১ রানে হারিয়ে দিল পাকিস্তানকে। আর এই জয়ের পর অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন—এই জয় তিনি উৎসর্গ করছেন গোটা দেশকে।
ম্যাচের আগে একটি ছোট ঘটনা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। বিপক্ষ অধিনায়কের সঙ্গে হাত না মেলানো নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু ম্যাচ শেষে সূর্যকুমার যে বার্তা দিলেন, তাতে বোঝা গেল তাঁর ফোকাস ছিল একটাই—খেলা এবং জয়।
সত্যি কথা বলতে কী, এই ম্যাচে সেই পুরনো উত্তেজনার ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না। শুরু থেকেই ভারত দাপট দেখিয়েছে। ব্যাট হাতে শক্ত ভিত গড়ে, তারপর বোলাররা পাওয়ার প্লেতেই পাকিস্তানকে চাপে ফেলে দেয়। একটা সময় মনে হচ্ছিল ম্যাচ যেন অনেক আগেই ভারতের দিকে হেলে গেছে।
৬১ রানের ব্যবধানটা কিন্তু ছোট নয়। এই স্কোরলাইনই বলে দেয়, ভারত কতটা নিয়ন্ত্রণে ছিল পুরো ম্যাচ জুড়ে। যারা ভেবেছিল শেষ ওভার পর্যন্ত রোমাঞ্চ থাকবে, তারা হয়তো একটু হতাশই হয়েছে।
ম্যাচ শেষে সূর্যকুমার যাদব খুব শান্ত গলায় বললেন, “এই জয় গোটা ভারতের জন্য। আমরা যেমন ক্রিকেট খেলতে চেয়েছিলাম, ঠিক তেমনটাই খেলেছি।” কথাগুলো শুনে বোঝা যায়, পরিকল্পনা অনুযায়ীই এগিয়েছে দল।
অনেক সময় বড় ম্যাচে চাপ কাজ করে। খেলোয়াড়রা নিজেদের স্বাভাবিক খেলা খেলতে পারেন না। কিন্তু এবার সেটা হয়নি। সূর্যের কথায় স্পষ্ট—দল আগেই ঠিক করেছিল কীভাবে খেলবে, আর মাঠে সেটাই বাস্তবায়ন করেছে।
এই ম্যাচে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন ঈশান কিশন। পিচ ছিল ধীরগতির। বল ঠিকমতো ব্যাটে আসছিল না। এমন উইকেটে অনেকেই রক্ষণাত্মক হয়ে যান। কিন্তু ঈশান একেবারে উল্টো রাস্তা বেছে নিলেন।
শুরুর দিকে উইকেট পড়ে যাওয়ার পর স্কোরবোর্ডে যখন ০/১, তখন কেউ একজন দায়িত্ব নিতেই হত। ঈশান সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। তিনি শুধু রান করেননি, আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে দিয়েছেন দলে।
সূর্যকুমারও তাঁর প্রশংসা করে বলেছেন, ঈশান আগেও এমন খেলেছে। ঘরোয়া ক্রিকেট হোক বা সাম্প্রতিক ম্যাচ, চাপের সময় সে আলাদা ভাবে ভাবতে পারে। এই মানসিকতাই বড় ক্রিকেটারের লক্ষণ।
ভাবুন তো, আপনি যদি পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখেন প্রথম প্রশ্নই কঠিন, তখন অনেকেই গুটিয়ে যায়। কিন্তু কেউ কেউ ঠিক তখনই ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঈশান সেই ধরনের খেলোয়াড়।
শুধু ঈশান নন, মিডল অর্ডারেও দারুণ অবদান রেখেছেন তিলক বর্মা, শিবম এবং রিঙ্কু। তারা প্রত্যেকে ছোট ছোট ইনিংস খেললেও দলের স্কোরকে শক্ত জায়গায় নিয়ে গেছে।
ক্রিকেটে অনেক সময় বড় ইনিংসের থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয় ছোট কিন্তু কার্যকরী ইনিংস। ধরুন, কেউ ২৫ বা ৩০ রান করল, কিন্তু সেই রান এল কঠিন সময়ে—তাহলেই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। এই ম্যাচেও ঠিক সেটাই হয়েছে।
ভারত প্রথমে ব্যাট করে তোলে ১৭৫ রান। প্রশ্ন উঠেছিল, এই স্কোর কি যথেষ্ট? সূর্যকুমার অবশ্য একেবারেই দ্বিধায় ছিলেন না। তাঁর মতে, প্রথমে ব্যাট করলে বোঝা কঠিন কত রান নিরাপদ। তবে ১৭৫ তোলার পর তাঁর মনে হয়েছিল দল গড় স্কোরের চেয়ে অন্তত ১৫-২০ রান বেশি করেছে।
তিনি এটাও বলেছেন, যদি স্কোর ১৫৫ হতো, তাহলে ম্যাচটা অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারত। অর্থাৎ ২০ রানের পার্থক্যই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।
ক্রিকেটে এই ছোট পার্থক্যটাই আসলে বড়। যেমন বাস ধরতে গেলে যদি এক মিনিট দেরি হয়, পুরো পরিকল্পনাই পাল্টে যায়। তেমনি ১৫-২০ রান বাড়তি থাকলে বোলাররা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বল করতে পারেন।
ব্যাটিংয়ের পর বোলিংয়েও ছিল ভারতের পূর্ণ দাপট। পাওয়ার প্লেতেই পাকিস্তানের চারটি উইকেট পড়ে যায়। এই সময়টাই ম্যাচের আসল টার্নিং পয়েন্ট।
হার্দিক পাণ্ডিয়া নতুন বলে দায়িত্ব নিয়ে সঠিক জায়গায় বল করেছেন। আর জসপ্রীত বুমরাহ আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তাঁকে বিশ্বের সেরা বোলার বলা হয়। তাঁর লাইন, লেংথ আর গতি—সব মিলিয়ে ব্যাটারদের কাছে তিনি এক দুঃস্বপ্ন।
শুধু তারাই নন, পুরো বোলিং ইউনিট একসঙ্গে কাজ করেছে। এক প্রান্তে চাপ তৈরি হলে অন্য প্রান্তে উইকেট এসেছে। এই সমন্বয়ই বড় দলের লক্ষণ।
একটা সময় ছিল যখন ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ মানেই ছিল স্নায়ুচাপের লড়াই। শেষ বল পর্যন্ত অনিশ্চয়তা। কিন্তু সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স দেখলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই ম্যাচ কি আর আগের মতো মহারণ?
এই ম্যাচে ভারত এতটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল যে শেষ দিকে উত্তেজনার জায়গাই থাকেনি। হয়তো সময় বদলেছে, দল বদলেছে, মানসিকতা বদলেছে। এখন ভারত পরিকল্পনা, ফিটনেস আর স্কিল—সব দিক থেকেই অনেক এগিয়ে।
ম্যাচ শেষে সূর্যকুমার জানিয়েছেন, আপাতত দল একসঙ্গে সময় কাটাতে চায়। পরের ম্যাচের পরিকল্পনা শুরু হবে আহমেদাবাদে পৌঁছানোর পর। প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ডস হলেও দল কাউকে হালকা ভাবে নিচ্ছে না।
এটাই পেশাদার মানসিকতা। বড় জয় পেয়েই যদি ঢিলেঢালা হয়ে যায় দল, তাহলে সমস্যা। কিন্তু সূর্যের কথায় বোঝা যায়, ফোকাস এক ম্যাচ থেকে অন্য ম্যাচে দ্রুত সরিয়ে নিতে জানে ভারত।
এই ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ হয়তো ইতিহাসে জায়গা করে নেবে উত্তেজনার জন্য নয়, বরং একতরফা আধিপত্যের জন্য। সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বে ভারত দেখিয়ে দিল, আবেগ নয়, পরিকল্পনা আর আত্মবিশ্বাসই শেষ কথা।
দেশবাসীর উদ্দেশে উৎসর্গ করা এই জয় শুধু স্কোরবোর্ডের জয় নয়। এটা মানসিকতার জয়, দলগত ঐক্যের জয়। আর যদি এমন পারফরম্যান্স চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে ভারত–পাক ম্যাচের গল্প হয়তো নতুন রূপেই লেখা হবে।


