টি-২০ বিশ্বকাপ মানেই রোমাঞ্চ, চাপ আর শেষ ওভার পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা। আর যখন মুখোমুখি হয় দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড, তখন ম্যাচটা আলাদা মাত্রা পায়। ১৪ ফেব্রুয়ারি আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম-এ ঠিক তেমনই এক হাই-ভোল্টেজ লড়াই দেখা গেল। শেষ পর্যন্ত ৭ উইকেটের দাপুটে জয়ে সুপার এইটে জায়গা পাকা করে নিল দক্ষিণ আফ্রিকা। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের সামনে এখন সমীকরণ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ম্যাচ শুধু দুই দলের লড়াই ছিল না, ছিল গ্রুপ পর্বের ভাগ্য নির্ধারণেরও লড়াই। যে দল জিতবে, তাদের পথ অনেকটাই মসৃণ হয়ে যাবে। সেই সুযোগটাই কাজে লাগাল প্রোটিয়া ব্রিগেড।
দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক Aiden Markram টস জিতে প্রথমে বোলিং নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। টি-২০ ক্রিকেটে অনেক সময় রান তাড়া করাই সুবিধাজনক হয়, বিশেষ করে বড় মাঠে রাতের ম্যাচে। সেই পরিকল্পনাই কাজে লাগাল দক্ষিণ আফ্রিকা।
প্রথমে ব্যাট করতে নেমে New Zealand national cricket team ভালো শুরু করেছিল। ওপেনাররা আত্মবিশ্বাসী ছিল, বল ঠিকঠাক ব্যাটে আসছিল। কিন্তু মাঝের ওভারগুলোতে গতি ধরে রাখতে পারেনি তারা।
টিম সেফার্ট ছোট্ট ইনিংস খেললেও ফিন অ্যালেন আক্রমণাত্মক ৩১ রান করে দলকে গতি দেন। এরপর মার্ক চ্যাপম্যান ৪৮ রানের লড়াকু ইনিংস খেলেন। ড্যারিল মিচেল ৩২ রান যোগ করেন। শেষদিকে জেমস নিশাম ২৩ রানে অপরাজিত থাকেন।
শুনতে সংখ্যাগুলো খারাপ না। কিন্তু সমস্যা ছিল ধারাবাহিকতার। গ্লেন ফিলিপস, রাচিন রবীন্দ্র ও অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। টি-২০তে ১৭৫ রান মোটামুটি লড়াই করার মতো স্কোর, কিন্তু এই উইকেটে সেটা নিরাপদ ছিল না।
২০ ওভারে ৭ উইকেটে ১৭৫ রান তোলে নিউজিল্যান্ড। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিং আক্রমণে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন মার্কো জানসেন, যিনি ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নেন। লুঙ্গি এনগিডি, কেশব মহারাজ ও করভিন বশ একটি করে উইকেট তুলে নেন। বোলাররা মাঝের ওভারগুলোতে রান আটকে দিয়ে ম্যাচের ভিত গড়ে দেন।
১৭৬ রানের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাট করতে নামে South Africa national cricket team। শুরুটা ছিল আত্মবিশ্বাসী। কুইন্টন ডি কক ২০ রান করে দলকে গতি দেন। যদিও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি, কিন্তু চাপটা কমিয়ে দেন।
এরপর মঞ্চ দখল করেন এইডেন মারক্রাম। ৪৪ বলে ৮৬ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন তিনি। তার ব্যাট থেকে আসে ৮টি চার ও ৪টি বিশাল ছক্কা। ইনিংসটা ছিল নিখুঁত সময়জ্ঞান আর দায়িত্ববোধের মিশ্রণ। যখন দরকার ছিল রোটেশন, তখন সিঙ্গেল নিয়েছেন। আর সুযোগ পেলেই বাউন্ডারি মেরেছেন।
রায়ান রিকেলটন ও ডেওয়াল্ড ব্রেভিস ২১ রান করে অবদান রাখেন। শেষদিকে ডেভিড মিলার ২৪ রানে অপরাজিত থেকে ম্যাচ শেষ করে আসেন। যেন বলছিলেন, “এখানেই শেষ, আর উত্তেজনা নয়।”
দক্ষিণ আফ্রিকা ৭ উইকেটে জয় তুলে নেয় এবং সুপার এইটে প্রথম দল হিসেবে জায়গা নিশ্চিত করে।
এই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিং পরিকল্পনা ছিল স্পষ্ট। তারা জানত নিউজিল্যান্ডের মিডল অর্ডারকে চাপে ফেলতে পারলে ম্যাচ নিজেদের দিকে আনা যাবে। মার্কো জানসেনের উচ্চতা আর বাউন্স কাজে লাগে। স্পিনাররা রান আটকে রাখেন। ফিল্ডিংও ছিল চমৎকার। ছোট ছোট মুহূর্ত, যেমন ডাইভ দিয়ে রান বাঁচানো, সেগুলোই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয়।
অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের বোলাররা চেষ্টা করলেও ধারাবাহিকভাবে চাপ তৈরি করতে পারেনি। লকি ফার্গুসন, জেমস নিশাম ও রাচিন রবীন্দ্র একটি করে উইকেট নেন, কিন্তু বড় ব্রেকথ্রু আসেনি ঠিক সময়ে।
এই জয়ের ফলে দক্ষিণ আফ্রিকা সুপার এইট পর্বে প্রবেশ নিশ্চিত করল। টুর্নামেন্টে তারা এখন আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। ব্যাটিং, বোলিং, নেতৃত্ব—সব বিভাগেই তারা ভারসাম্য দেখিয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের জন্য পরিস্থিতি এখন জটিল। তাদের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে শুধু জিতলেই হবে না, নেট রান রেটের দিকেও নজর রাখতে হবে। টি-২০ বিশ্বকাপে ছোট ভুলও বড় মূল্য চোকাতে হয়, আর এই ম্যাচে সেই শিক্ষাই পেল কিউইরা।
এই ম্যাচ আমাদের আবার মনে করিয়ে দিল, টি-২০ ক্রিকেটে শুধু বড় নাম থাকলেই হয় না। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, শান্ত মাথা আর সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষমতা। মারক্রামের ইনিংস দেখলে বোঝা যায়, অধিনায়ক সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলে দল কতটা আত্মবিশ্বাস পায়।
ভাবো, তুমি যদি পরীক্ষার হলে সবার আগে ঠান্ডা মাথায় প্রশ্ন ধরতে পারো, বাকিরাও তখন সাহস পায়। ঠিক তেমনই মারক্রামের ব্যাটিং পুরো দলকে স্থিরতা দিয়েছে।
সুপার এইটে এখন দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। নকআউটের দিকে এগোতে গেলে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডকে ফিরে আসার জন্য নতুন পরিকল্পনা করতে হবে। তাদের অভিজ্ঞতা আছে, প্রতিভাও আছে। কিন্তু সময় খুব কম।
এই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা দেখিয়ে দিল, তারা শুধু অংশ নিতে আসেনি—তারা শিরোপার জন্য লড়তে এসেছে। আর নিউজিল্যান্ড? তারা এখনও লড়াইয়ে আছে, তবে পথটা এখন অনেক কঠিন।
টি-২০ বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিটি ম্যাচ যেন একেকটা গল্প। এই গল্পে নায়ক ছিলেন এইডেন মারক্রাম। আর দর্শকরা পেলেন এক উত্তেজনাপূর্ণ ক্রিকেট সন্ধ্যা, যা সহজে ভোলার নয়।


