ক্রিকেট বিশ্বে আইসিসির একটি সিদ্ধান্ত ঘিরে আবারও শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। হাতে যখন একাধিক বিকল্প দল ছিল, তখন বাছাই পর্বে তলানিতে থাকা স্কটল্যান্ডকেই কেন বিশ্বকাপে সুযোগ দিল আইসিসি—এই প্রশ্নই এখন ক্রিকেটপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যোগ্যতা অর্জন করা বাংলাদেশ বাদ পড়ে গেল, আর সুযোগ পেল এমন একটি দল যারা সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট পায়নি। বিষয়টি কি শুধুই অতীত পারফরম্যান্সের বিচার, নাকি এর পেছনে আছে আরও গভীর কৌশলগত হিসাব?
বিশ্বকাপে খেলার জন্য নির্দিষ্ট বাছাই পর্ব থাকে। সেই বাছাই পর্ব পেরিয়েই বাংলাদেশ তাদের জায়গা নিশ্চিত করেছিল। নিয়ম অনুযায়ী, যোগ্যতা অর্জনকারী দলকেই বিশ্বকাপে খেলতে দেওয়ার কথা। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে আইসিসি চাইলে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এবার ঠিক সেটাই হয়েছে। বাংলাদেশের জায়গায় খেলতে যাচ্ছে স্কটল্যান্ড, যারা বাছাই পর্বে প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি।
এই সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—যোগ্য দলকে বাদ দিয়ে অযোগ্য দলকে নেওয়ার যুক্তি কোথায়?
স্কটল্যান্ড ছাড়াও আইসিসির সামনে একাধিক বিকল্প খোলা ছিল। ইউরোপের জার্সি, এশিয়ার হংকং, ওশেনিয়ার পাপুয়া নিউগিনি কিংবা বারমুডার মতো দলগুলিও আলোচনায় ছিল। এমনকি এশিয়ার কোনো দলকে নিলে আয়োজক ও বিপণনের দিক থেকে আইসিসির লাভও হতে পারত। তবুও সব সম্ভাবনা বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকেই বেছে নেওয়া হয়েছে।
এখানেই প্রশ্নটা আরও জোরালো হয়—কেন স্কটল্যান্ড? কেন জার্সি নয়, যারা ইউরোপীয় বাছাইয়ে স্কটল্যান্ডের চেয়েও ভালো করেছিল?
নিয়মের হিসেবে দেখলে, স্কটল্যান্ডের বদলে জার্সিই ছিল সবচেয়ে বড় দাবিদার। চলতি বছরে ইউরোপ অঞ্চলের বাছাই পর্বে জার্সি স্কটল্যান্ডের উপরে অবস্থান করেছিল। কিন্তু আইসিসি এখানে শুধুমাত্র সাম্প্রতিক ফল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পারফরম্যান্সকে গুরুত্ব দিয়েছে।
স্কটল্যান্ডের অতীত বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স আইসিসির সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে। তারা নিয়মিত বড় দলের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। আর এই অভিজ্ঞতাকেই বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে আইসিসি।
ইউরোপের ক্রিকেট সার্কিটে স্কটল্যান্ড এখন আর ছোট নাম নয়। আইসিসির অ্যাসোসিয়েট সদস্য হলেও, গত কয়েকটি টি-২০ বিশ্বকাপে তারা নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
২০২৪ সালের টি-২০ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ড ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দেয় ইংল্যান্ডকে হারিয়ে। সেই আসরে তারা গ্রুপে তৃতীয় হয় এবং অল্পের জন্য পরের রাউন্ডে যেতে পারেনি। তার আগের বিশ্বকাপেও স্কটল্যান্ডের পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। ২০২২ সালে তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো সাবেক চ্যাম্পিয়ন দলকে হারায়। ২০২১ সালের বিশ্বকাপে তো তারা সুপার-১২ পর্বেই জায়গা করে নেয়।
এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই আইসিসিকে বোঝায় যে, চাপের মঞ্চে স্কটল্যান্ড লড়াই করতে জানে।
আরেকটি বড় কারণ হলো আইসিসির র্যাঙ্কিং। যেসব দল বিশ্বকাপে সরাসরি জায়গা পায়নি, তাদের মধ্যে র্যাঙ্কিংয়ে সবার উপরে রয়েছে স্কটল্যান্ড। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবেই তারা এই অবস্থানে আছে।
আইসিসির দৃষ্টিতে, বিশ্বকাপে এমন দল দরকার যারা বড় দলের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে এবং টুর্নামেন্টের মান ধরে রাখবে। সেই বিবেচনায় স্কটল্যান্ডকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পছন্দ বলেই মনে করেছে সংস্থাটি।
এই সিদ্ধান্ত একেবারে নতুন নয়। ২০০৯ সালে রাজনৈতিক কারণে জিম্বাবোয়ে ইংল্যান্ডে দল পাঠাতে পারেনি। সেই সময় আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে স্কটল্যান্ডকে সুযোগ দিয়েছিল। অর্থাৎ বিশেষ পরিস্থিতিতে স্কটল্যান্ডকে বেছে নেওয়ার নজির আগেও রয়েছে।
এবারও সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভর করেই আইসিসি একই পথে হাঁটল বলে মনে করছেন অনেক ক্রিকেট বিশ্লেষক।
তবে সব যুক্তির পরও বিতর্ক থামছে না। অনেকের মতে, নিয়ম মেনে যোগ্যতা অর্জন করা বাংলাদেশকে বাদ দেওয়া ক্রিকেটের ন্যায্যতার প্রশ্ন তোলে। আবার কেউ কেউ বলছেন, আইসিসি আসলে বাণিজ্যিক ও প্রতিযোগিতামূলক দিক মাথায় রেখেই স্কটল্যান্ডকে নিয়েছে।
সরকারিভাবে এখনও স্কটল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বকাপে খেলার এই সুযোগ তারা হাতছাড়া করবে না।
বাংলাদেশের বদলে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আইসিসির জন্য সহজ ছিল না। একদিকে নিয়ম ও ন্যায্যতা, অন্যদিকে অভিজ্ঞতা ও টুর্নামেন্টের মান—এই দুইয়ের ভারসাম্য রাখতে গিয়েই আইসিসি এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সময়ই বলবে, এই সিদ্ধান্ত ক্রিকেট ইতিহাসে সঠিক প্রমাণিত হয় নাকি নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে এক কথা নিশ্চিত, স্কটল্যান্ডের জন্য এটি আরেকটি বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার সুবর্ণ সুযোগ।


