ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই আলাদা উত্তেজনা। এই ম্যাচে হার মানে শুধু স্কোরবোর্ডে পরাজয় নয়, আবেগেও বড় ধাক্কা। সাম্প্রতিক হারে সেই ধাক্কাই যেন সামলাতে পারছেন না শাহিদ আফ্রিদি। রাগ, হতাশা আর ক্ষোভ—সব মিলিয়ে তিনি সরাসরি আঙুল তুলেছেন নিজের জামাই শাহিন আফ্রিদির দিকেই। শুধু সমালোচনা নয়, দল থেকেই বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এই ঘটনাই এখন পাকিস্তান ক্রিকেটে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।
ভারতের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে শাহিন মাত্র দুই ওভার বল করে ৩১ রান দেন। একজন সিনিয়র পেসারের কাছে এমন পারফরম্যান্স দলকে চাপে ফেলে দেয়। বিশেষ করে যখন ম্যাচটা এত বড়, তখন প্রত্যাশাও থাকে অনেক বেশি।
শাহিন শুধু একজন সাধারণ ক্রিকেটার নন। তিনি পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণের অন্যতম ভরসা। অনেক সময় তাকে বলা হয় ভারতের বিপক্ষে “ট্রাম্প কার্ড”। কিন্তু এই ম্যাচে তিনি সেই ভূমিকা পালন করতে পারেননি। ফলাফল—পরাজয়, আর তার সঙ্গে বাড়তি সমালোচনা।
মজার ব্যাপার হলো, শাহিন আর শাহিদের সম্পর্ক শুধুই ক্রিকেটীয় নয়, পারিবারিকও। শাহিন হলেন শাহিদ আফ্রিদির জামাই। সাধারণত এমন সম্পর্কে প্রকাশ্যে কঠোর মন্তব্য খুব কমই শোনা যায়। কিন্তু এবার আফ্রিদি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন—তার হাতে ক্ষমতা থাকলে তিনি শাহিনকে দল থেকে বাদ দিতেন।
শুধু শাহিন নয়, তিনি আরও দুই সিনিয়র ক্রিকেটার—বাবর ও শাদাব—কে বসিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। তার মতে, বছরের পর বছর সুযোগ পেয়েও যারা বড় ম্যাচে ফল দিতে পারে না, তাদের জায়গায় নতুন মুখদের সুযোগ দেওয়া উচিত।
আফ্রিদির বক্তব্যের মূল সুরটা পরিষ্কার। তিনি মনে করেন, সিনিয়র ক্রিকেটারদের শুধু নাম দিয়ে দলে টিকে থাকা উচিত নয়। মাঠে দায়িত্ব নিতে হবে। কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে না পারলে অভিজ্ঞতার মূল্য কোথায়?
ভাবো, একটা অফিসে কেউ দশ বছর ধরে কাজ করছে, কিন্তু জরুরি প্রজেক্টে বারবার ভুল করছে। তখন কি শুধু অভিজ্ঞতার জন্য তাকে রেখে দেওয়া ঠিক? আফ্রিদির কথায় সেই যুক্তিই ফুটে উঠেছে।
তিনি বলেন, এতদিন খেলেও যদি খেলোয়াড়রা পরিস্থিতি বুঝে খেলতে না পারে, তবে নতুনদের সুযোগ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তার মতে, এমনকি নামিবিয়ার বিপক্ষের ম্যাচেও এই পরিবর্তন আনা উচিত।
অতীতে বহুবার শাহিনের পাশে দাঁড়িয়েছেন শাহিদ আফ্রিদি। কঠিন সময়েও তার উপর আস্থা রেখেছেন। ভারতের বিরুদ্ধে শাহিনই পাকিস্তানের বড় অস্ত্র—এমন কথাও বলেছেন তিনি বারবার।
কিন্তু এই হারের পর সেই সমর্থন যেন আর টিকল না। এবার তিনি আবেগ নয়, পারফরম্যান্সকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। এতে বোঝা যায়, পরিস্থিতি কতটা হতাশাজনক হলে একজন শ্বশুর এমন প্রকাশ্য মন্তব্য করতে পারেন।
এই হারের পর শুধু খেলোয়াড়রা নয়, সমালোচনার মুখে পড়েছেন বোর্ড কর্মকর্তারাও। বিশেষ করে মোহসিন নকভিকে নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা।
ম্যাচ চলাকালীন তিনি পুরো সময় মাঠে ছিলেন না। পাকিস্তানের পাঁচ উইকেট পড়ার পরই তিনি মাঠ ছেড়ে চলে যান। এমন আচরণ অনেক সমর্থকের চোখে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—কঠিন সময়ে নেতৃত্ব কোথায়?
ক্রিকেটপ্রেমীদের মতে, শুধু খেলোয়াড়দের নয়, বোর্ডেরও দায় আছে। পরিকল্পনা, দল নির্বাচন, মানসিক প্রস্তুতি—সবকিছুতেই নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—পাকিস্তান কি সত্যিই বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটবে?
দল থেকে একসঙ্গে তিনজন সিনিয়রকে বাদ দেওয়া সহজ সিদ্ধান্ত নয়। এতে ড্রেসিংরুমের পরিবেশ বদলে যেতে পারে। আবার নতুনদের সুযোগ দিলে দল নতুন উদ্যম পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, পরিবর্তন দরকার। তবে সেটা আবেগে নয়, পরিকল্পনা করে করতে হবে। শুধু এক ম্যাচের ফল দেখে সিদ্ধান্ত নিলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হতে পারে।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ শুধু ক্রিকেট নয়, দুই দেশের আবেগের প্রশ্ন। এখানে হার মানে সমর্থকদের জন্য মানসিক ধাক্কা। তাই এমন ম্যাচে পারফরম্যান্স খারাপ হলে প্রতিক্রিয়াও হয় তীব্র।
এই হারের পর সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ খেলোয়াড়দের দায় দিচ্ছেন, কেউ বোর্ডকে। আবার কেউ বলছেন, অতিরিক্ত চাপই এমন পারফরম্যান্সের কারণ।
এখন পাকিস্তান দলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—সমালোচনা সামলে ঘুরে দাঁড়ানো। দলকে মানসিকভাবে শক্ত হতে হবে। সিনিয়রদের পারফরম্যান্স প্রমাণ করতে হবে। আর যদি পরিবর্তন আসে, তবে নতুনদের দায়িত্ব নিতে হবে দ্রুত।
শাহিদ আফ্রিদির বক্তব্য হয়তো কঠোর, কিন্তু তিনি যে হতাশা থেকে বলছেন, সেটা স্পষ্ট। তিনি চান পাকিস্তান জিতুক। তার চোখে যদি পরিবর্তনই একমাত্র পথ হয়, তবে সেই আলোচনা এখন জোরদার হবেই।
শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটে একটা কথাই সত্যি—নাম নয়, পারফরম্যান্সই শেষ কথা। আগামী ম্যাচগুলোই ঠিক করবে, পাকিস্তান দল সমালোচনার জবাব দিতে পারে কি না।


