ক্রিকেট কখনও শুধু খেলা থাকে না। কখনও সেটা আবেগ হয়ে যায়, সম্পর্ক হয়ে যায়, এমনকি দেশের সীমানা পেরিয়ে ভ্রাতৃত্বের বার্তা হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে ঠিক এমনই এক আবেগঘন দৃশ্য দেখল ক্রিকেটবিশ্ব। মাঠে পাকিস্তানের হার, আর গ্যালারিতে এক পাক-সমর্থকের অশ্রু—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানায়।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের মুখোমুখি হয়েছিল পাকিস্তান। ক্রিকেটপ্রেমীরা জানেন, এই ম্যাচ মানেই আলাদা উত্তেজনা। যেন ফাইনালের চেয়েও বেশি চাপ। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে ৬৪ রানের ব্যবধানে হেরে যায় পাকিস্তান। অধিনায়ক বাবর আজম ও পেসার শাহিন আফ্রিদি–দের পারফরম্যান্স প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
খেলার শুরু থেকেই পাকিস্তান চাপে ছিল। ব্যাটিংয়ে ধার দেখা যায়নি, বোলিংয়েও ছিল না আগের সেই আগ্রাসন। ফলে ভারতের জয়টা ছিল একদম নিশ্চিত ও আত্মবিশ্বাসী। পাকিস্তানি সমর্থকদের মুখে তখন হতাশার ছাপ স্পষ্ট।
ম্যাচ শেষে এক আবেগঘন দৃশ্য ভাইরাল হয়। পাকিস্তানের পতাকা আঁকা মুখ, চোখভরা জল, কাঁপা গলায় কথা বলা এক তরুণ সমর্থক। তিনি বলেন, “পাকিস্তান আমার জীবন। আজ খুব কষ্ট হচ্ছে। অন্তত লড়াই করে হারতে পারত।”
এরপর হঠাৎ করেই তিনি বাংলাদেশের প্রসঙ্গ তোলেন। বলেন, “সরি বাংলাদেশি ভক্তরা। খুব আশা করেছিলাম আজ আমরা জিতব। ঠিক করেছিলাম, জিতলে পাকিস্তানের জন্য উদযাপন করব না—বাংলাদেশের জন্য করব। জয়টা তাদের উৎসর্গ করব।”
ভাবুন তো, নিজের দলের হার সামলাতেই কষ্ট হয়। সেখানে অন্য একটি দেশের জন্য এমন অনুভূতি! এটা শুধু ক্রিকেট নয়, এর ভেতরে আছে আবেগ, সম্মান আর বন্ধুত্বের একটা অদৃশ্য সেতু।
এই আবেগের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা। বাংলাদেশের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমান–কে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারত বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। সেই সময় পাকিস্তান ঘোষণা করেছিল, তারা বাংলাদেশের পাশে থাকবে। এমনকি ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ বয়কটের কথাও ওঠে।
পাকিস্তানের অধিনায়ক প্রকাশ্যে বাংলাদেশকে ‘ভাই’ বলে উল্লেখ করেন। যদিও শেষ পর্যন্ত ম্যাচ বয়কট হয়নি, তবুও সেই বার্তা দুই দেশের সমর্থকদের মনে আলাদা জায়গা করে নেয়।
এই কারণেই ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের ম্যাচ শুধু তাদের জন্য ছিল না। বাংলাদেশের অনেক সমর্থকও নজর রেখেছিলেন খেলায়। কেউ হয়তো চেয়েছিলেন ভারতের হার, কেউ চেয়েছিলেন পাকিস্তানের জয় হোক প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে।
পাক-সমর্থকের কথায় একটা জিনিস স্পষ্ট—হার মানলেও আশা ছাড়েননি তারা। তিনি বলেন, “হয়তো আল্লাহর পরিকল্পনা অন্যরকম। আমরা হাল ছাড়ব না। বিশ্বকাপ জিতবই, ভারতকেও হারাব। আর তখন বাংলাদেশি ভাইদের সঙ্গে উদযাপন করব।”
এই কথাগুলো শুনলে মনে হয়, ক্রিকেট যেন শুধু স্কোরবোর্ডের খেলা নয়। এটা বিশ্বাসের খেলা, স্বপ্নের খেলা। আপনি যেমন কোনো পরীক্ষায় ফেল করলে ভাবেন, ‘পরের বার দেখিয়ে দেব’, ঠিক তেমনই তাদের মনোভাব।
ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ মানেই আলাদা উত্তেজনা। ইতিহাস, রাজনীতি, আবেগ—সব মিলিয়ে এটা শুধু একটি ক্রিকেট ম্যাচ নয়, বরং কোটি মানুষের হৃদয়ের লড়াই। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হয়।
ভারতের জয় যেমন তাদের সমর্থকদের উচ্ছ্বসিত করে, তেমনি পাকিস্তানের হার তাদের ভক্তদের ভেঙে দেয়। কিন্তু এবারের ম্যাচে একটা বাড়তি মাত্রা ছিল—বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। ফলে আবেগটা আরও গভীর হয়ে ওঠে।
ম্যাচের পর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সেই কান্নার ভিডিও। কেউ সমবেদনা জানিয়েছেন, কেউ বলেছেন খেলাধুলায় এমন আবেগ স্বাভাবিক। আবার অনেক বাংলাদেশি সমর্থক সেই ভক্তের বক্তব্যে আপ্লুত হয়েছেন।
একজন লিখেছেন, “ক্রিকেট আমাদের আলাদা করে না, এক করে।” আরেকজন বলেছেন, “আজ না হোক, একদিন একসঙ্গে উদযাপন হবে।”
ক্রিকেটের মাঠে জয়-পরাজয় থাকবেই। আজ পাকিস্তান হেরেছে, কাল হয়তো জিতবে। কিন্তু এই ম্যাচ দেখাল, খেলার ভেতরেও মানবিকতা থাকে, সম্পর্ক থাকে। এক পাকিস্তানি ভক্তের চোখের জল মনে করিয়ে দিল—ক্রিকেট কেবল ব্যাট-বলের লড়াই নয়, এটা হৃদয়ের সংযোগ।
হয়তো সেই ভক্তের স্বপ্ন আজ পূরণ হয়নি। কিন্তু তার কথায় যে আবেগ ছিল, তা সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে গিয়েছে। আর সেটাই ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় জয়।

