পাকিস্তানের ক্রিকেট মানেই অনিশ্চয়তা, উত্তেজনা আর হঠাৎ জ্বলে ওঠার গল্প। এবারের বিশ্বকাপে ঠিক সেই চিত্রই আবার দেখা গেল। শুরুটা ছিল ধীরস্থির, কিন্তু একটু একটু করে ম্যাচ গড়াতেই যেন বদলে গেল পুরো দৃশ্যপট। দুই ওপেনারের দৃঢ় ব্যাটিংয়ে একসময় স্কোরবোর্ডে রান উঠতে থাকল ঝড়ের গতিতে। দর্শকরা চোখের পলক ফেলার আগেই ম্যাচের রাশ চলে গেল পাকিস্তানের হাতে।
এই ম্যাচে পাকিস্তানের দুই ওপেনার শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। প্রথম ১৬ ওভার পর্যন্ত তাঁরা একপ্রকার একচেটিয়াভাবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। বোলারদের ওপর চাপ বাড়িয়ে তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন শক্ত ভিত। তখনই স্কোরবোর্ডে জমা পড়ে যায় ১৭৬ রান, যা যে কোনও দলের জন্যই বিশাল এক বার্তা।
একদিকে ছিলেন ফখর জামান, যিনি নিজের স্বভাবসুলভ আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে দ্রুত রান তুলছিলেন। অন্যদিকে ছিলেন সাহিবজাদা ফারহান, যিনি ধীরে কিন্তু নিখুঁতভাবে ইনিংস সাজাচ্ছিলেন। দুজনের জুটিতে পাকিস্তানের ইনিংস যেন স্বপ্নের মতো এগোচ্ছিল।
ফখর জামান ৮৪ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে আউট হন। তাঁর ইনিংসটি ছিল পাওয়ার আর টাইমিংয়ের সুন্দর মিশেল। বাউন্ডারি আর দ্রুত সিঙ্গেল-ডাবলে তিনি প্রতিপক্ষ বোলারদের চাপে রেখেছিলেন। যদিও তিনি সেঞ্চুরি পাননি, তবুও তাঁর এই ইনিংস পাকিস্তানের বড় স্কোরের ভিত তৈরি করে দেয়।
ফখরের আউট হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন রান গতি হয়তো একটু কমবে। কিন্তু তখনই দৃশ্যে আসেন সাহিবজাদা ফারহান।
সাহিবজাদা ফারহান এই ম্যাচে যা করলেন, তা শুধু পাকিস্তানের জন্য নয়, গোটা বিশ্বকাপের ইতিহাসেই আলাদা জায়গা করে নিল। মাত্র ৫৯ বলেই তিনি তুলে নেন ঝকঝকে ১০০ রান। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল ধৈর্য, ছিল আগ্রাসন, আর ছিল পরিপক্বতার ছাপ।
এই সেঞ্চুরির মধ্য দিয়েই তিনি ভেঙে দেন একটি বড় বিশ্বরেকর্ড। এর আগে এক বিশ্বকাপে সর্বাধিক রানের মালিক ছিলেন বিরাট কোহলি, যিনি ছয় ম্যাচে ৩১৯ রান করেছিলেন। সাহিবজাদা ফারহান সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে এবার বিশ্বকাপে মোট ৩৮৩ রান সংগ্রহ করেন। এই কীর্তি তাঁকে বিশ্ব ক্রিকেটের আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে।
সহজভাবে বললে, এটা ছিল এমন এক ইনিংস, যেটা দেখে যে কোনও তরুণ ক্রিকেটার স্বপ্ন দেখতে শুরু করবে।
দুই ওপেনার যখন ক্রিজে ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল পাকিস্তান অনায়াসেই ২৩০ বা তারও বেশি রান তুলে ফেলবে। কিন্তু বাস্তবতা একটু আলাদা হলো। ফখর আর ফারহান আউট হওয়ার পর মিডল অর্ডার প্রত্যাশা অনুযায়ী রান গতি ধরে রাখতে পারেনি।
ফলে ইনিংসের শেষদিকে রান কিছুটা ধীর হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২১২ রানে। স্কোরটা খারাপ নয়, কিন্তু ওপেনারদের শুরু দেখার পর অনেকেই আরও বড় কিছুর আশা করেছিলেন।
এই রান তোলার পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় আলোচনা। কারণ এই বিশ্বকাপে এর আগে পাকিস্তানের ব্যাটিং এমনভাবে জ্বলে ওঠেনি। একাধিক ম্যাচে তারা ব্যাট হাতে ব্যর্থ হয়েছে, যা সমর্থকদের হতাশ করেছিল।
তাই হঠাৎ করে এমন পারফরম্যান্স দেখে অনেক নেটিজেন অবাক হয়ে যান। তাঁদের প্রশ্ন, হঠাৎ করেই কীভাবে পাকিস্তানের ব্যাটিং এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠল? কেউ কেউ একে বলছেন আত্মবিশ্বাসের ফল, আবার কেউ বলছেন প্রতিপক্ষের কৌশলগত ভুলের সুযোগ নিয়েছে পাকিস্তান।
এই ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বোলিং ও ফিল্ডিং খুব একটা খারাপ ছিল না। তবুও ওপেনারদের আটকাতে না পারায় প্রশ্ন উঠেছে দলটির পরিকল্পনা নিয়ে। কিছু দর্শক এবং বিশ্লেষক এমনও মন্তব্য করেছেন যে, শ্রীলঙ্কা বড় ব্যবধানে হারলেও নাকি তাদের বিশেষ ক্ষতি নেই।
কারণ যদি পাকিস্তান সেমিফাইনালে ওঠে, তাহলে তাদের ম্যাচ হবে শ্রীলঙ্কার মাটিতে। এই যুক্তি সামনে এনে কেউ কেউ ম্যাচের ঢিমেতাল পারফরম্যান্স নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। যদিও এগুলো সবই অনুমানভিত্তিক কথা।
এই ধরনের অভিযোগ বা সন্দেহকে সরাসরি সত্য বলা যায় না। ক্রিকেট এমনই এক খেলা, যেখানে প্রতিদিন নতুন গল্প তৈরি হয়। কখনও ফেভারিট দল হারে, আবার কখনও আন্ডারডগ দল ইতিহাস গড়ে।
এই ম্যাচটাও তার ব্যতিক্রম নয়। পাকিস্তানের ব্যাটিং শক্তি, শ্রীলঙ্কার কৌশল, মাঠের পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে ফলাফল গড়ে উঠেছে। একে ষড়যন্ত্র বা ইচ্ছাকৃত ঢিলেঢালা পারফরম্যান্স বলা ঠিক নয়।
এই ম্যাচের পর বিশ্বকাপের সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান প্রমাণ করেছে, সুযোগ পেলে তারা যে কোনও দলের বিরুদ্ধে বড় স্কোর করতে পারে। আবার শ্রীলঙ্কার সামনে রয়েছে নিজেদের ভুল থেকে শেখার সুযোগ।
বিশ্বকাপ মানেই চাপ, মানেই হিসাব-নিকাশ। আজ যে দল পিছিয়ে, কালই সে দল ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তাই এই ম্যাচকে এক কথায় বিচার করা কঠিন।
পাকিস্তানের এই ইনিংস ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে নতুন করে আগ্রহ জাগিয়েছে। সাহিবজাদা ফারহানের রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরি আর ওপেনিং জুটির দাপট বিশ্বকাপের স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে। আর শ্রীলঙ্কার জন্য এই ম্যাচ হয়তো একটা শিক্ষা, যেখান থেকে তারা সামনে আরও শক্ত হয়ে ফিরবে।
ক্রিকেটের সৌন্দর্য এখানেই। একদিন যা অসম্ভব মনে হয়, পরের দিন সেটাই বাস্তব হয়ে ওঠে। তাই অপেক্ষা এখন পরের ম্যাচগুলোর দিকে, যেখানে হয়তো আরও বড় চমক অপেক্ষা করে আছে।


