টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ মানেই আলাদা উত্তেজনা। আর সেখানে যদি মুখোমুখি হয় ভারত আর পাকিস্তান, তাহলে তো কথাই নেই। এই ম্যাচে যেন ক্রিকেটের বাইরে গিয়েও একটা আবেগ কাজ করে। সেই আবেগের লড়াইয়েই আবারও জিতল ভারত। ৬১ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়ে সুপার এইটে জায়গা নিশ্চিত করল টিম ইন্ডিয়া। আর পাকিস্তানের জন্য থেকে গেল হতাশা আর আফসোস।
এই ম্যাচে ভারত করেছিল ১৭৫ রান। জবাবে পাকিস্তান থেমে যায় মাত্র ১১৪ রানে। ভাবা যায়? আমেরিকা আর নামিবিয়ার থেকেও কম রানে শেষ হয় তাদের ইনিংস। বিশ্বকাপে এই নিয়ে অষ্টমবার পাকিস্তানকে হারাল ভারত। সংখ্যাটা নিজেই গল্প বলে দেয়।
ম্যাচের শুরুটা কিন্তু একদম মসৃণ ছিল না। প্রথমেই উইকেট হারায় ভারত। কিন্তু এরপর যা করলেন ঈশান কিষান, সেটা এক কথায় দুর্দান্ত। তিনি যেন শুরু থেকেই ঠিক করে নামলেন—আজ থামবেন না।
মাত্র ২৭ বলে তুলে নিলেন অর্ধশতরান। পাকিস্তানের বোলাররা একের পর এক চেষ্টা করলেন, কিন্তু ঈশান থামলেন না। চার-ছক্কার বন্যা বইয়ে দিলেন। ১০টি চার আর ৩টি ছক্কায় ৪০ বলে ৭৭ রান করে তিনি ভারতের ইনিংসকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে দেন। যখন তিনি আউট হন, তখন ভারত অনেকটাই নিরাপদ জায়গায়।
অনেকেই হয়তো ভাবছিলেন, তিনি কিছুদিন আগেও জাতীয় দলের নিয়মিত পরিকল্পনায় ছিলেন না। কিন্তু মাঠে নেমে তিনি প্রমাণ করে দিলেন—সুযোগ পেলে কী করা যায়।
ঈশান ঝড় তুললেও মাঝের দিকে কিছুটা চাপে পড়ে ভারত। পরপর দুই উইকেট পড়ে যায়। তখন প্রয়োজন ছিল কেউ একজন দাঁড়িয়ে থেকে ইনিংস সামলাবে। সেই কাজটাই করেন সূর্যকুমার যাদব।
৩২ রান করেন তিনি। যদিও শেষের দিকে রানের গতি তেমন বাড়াতে পারেননি, তবুও তাঁর ইনিংস দলের ভারসাম্য ধরে রাখে। পাকিস্তানের স্পিনার উসমান তারিকের বিরুদ্ধে কিছুটা সমস্যা হলেও ভারতীয় ব্যাটাররা শেষ পর্যন্ত সামলে নেন।
শেষ ওভারে রিঙ্কু সিং আর শিবম দুবে গুরুত্বপূর্ণ রান তোলেন। বিশেষ করে সেই ওভারে ১৬ রান উঠে যায়। এতে ভারতের স্কোর দাঁড়ায় ১৭৫। কলম্বোর প্রেমদাসা স্টেডিয়ামের ধীর পিচে এই রানটা মোটেও ছোট নয়।
১৭৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায়। প্রথম দুই ওভারেই ভেঙে পড়ে তাদের টপ অর্ডার। হার্দিক পান্ডিয়া প্রথম ওভারেই উইকেট নেন। তারপর জশপ্রীত বুমরাহর আগুনে বোলিং।
বুমরাহ যেন মিসাইল ছুড়ছিলেন। এক ওভারেই দুই উইকেট। সাইম আয়ুব আর সলমন দ্রুত ড্রেসিংরুমে ফিরে যান। তখনই বোঝা যায়, ম্যাচ ভারতের দিকেই ঝুঁকে গেছে।
বাবর আজম কিছুক্ষণ টিকে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু রান তোলার গতি ছিল খুব ধীর। চাপ বাড়তেই থাকে। অক্ষর প্যাটেলের স্পিনে তিনি শেষ পর্যন্ত আউট হন।
এই ম্যাচে ভারতের বোলিং ইউনিট একসঙ্গে কাজ করেছে। হার্দিক, বুমরাহ, অক্ষর, বরুণ—প্রত্যেকে দুইটি করে উইকেট নেন। কেউ আলাদা করে হিরো না হলেও দলগত পারফরম্যান্সটাই ম্যাচ জিতিয়ে দেয়।
উসমান খান একাই কিছুটা লড়াই করেন। ৪৪ রান করেন তিনি। কিন্তু অন্য প্রান্ত থেকে সমর্থন পাননি। শাদাব, নওয়াজরা আসা-যাওয়ার মধ্যেই ছিলেন। ফলে রান তাড়া করা ধীরে ধীরে অসম্ভব হয়ে ওঠে।
শেষ দিকে শাহিন আফ্রিদি ২৩ রান করে কিছুটা লড়াইয়ের ছাপ রাখেন। কিন্তু ততক্ষণে ম্যাচ হাতছাড়া হয়ে গেছে। পাকিস্তান গুটিয়ে যায় ১১৪ রানে।
এই জয়ের ফলে ভারত সরাসরি সুপার এইটে জায়গা করে নেয়। শুধু জয় নয়, বড় ব্যবধানের জয় দলের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বকাপে ধারাবাহিকভাবে পাকিস্তানকে হারানোর রেকর্ড আরও শক্ত হলো।
ভাবুন তো, এত চাপ, এত আলোচনা, এত রাজনৈতিক আবহ—সবকিছুর পর মাঠে এসে এমন পারফরম্যান্স দেওয়া সহজ নয়। কিন্তু ভারত সেটাই করল। ব্যাটে-বলে স্পষ্ট জবাব দিল।
পাকিস্তানের জন্য এই হার শুধু একটি ম্যাচ হার নয়। এটা আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা। বড় ম্যাচে বারবার ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বোলিংয়ে কিছু ভালো মুহূর্ত থাকলেও ব্যাটিং পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে এমন পারফরম্যান্স ভক্তদের হতাশ করবেই। বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই আলাদা উত্তাপ। ইতিহাস, আবেগ, গর্ব—সব একসঙ্গে মিশে থাকে। এই ম্যাচ সেই ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় যোগ করল। অষ্টমবারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারাল ভারত।
সংখ্যাটা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে ভারতের আধিপত্যের গল্প। আর পাকিস্তানের সামনে তৈরি হচ্ছে নতুন চ্যালেঞ্জ—কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে তারা?
শেষ পর্যন্ত এই ম্যাচ একটাই কথা মনে করিয়ে দেয়—ক্রিকেটে কথার চেয়ে কাজ বড়। বয়কট, আলোচনা, বিতর্ক—সব কিছুর উত্তর মেলে মাঠেই। আর সেদিন মাঠে ভারতের জবাব ছিল পরিষ্কার, আত্মবিশ্বাসী এবং নির্দয়।
এখন সামনে সুপার এইট। লড়াই আরও কঠিন হবে। কিন্তু এই পারফরম্যান্স দেখার পর একটা কথা বলাই যায়—এই টিম ইন্ডিয়াকে থামানো সহজ হবে না।

