বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড অবশেষে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য ১৫ সদস্যের দল ঘোষণা করেছে। ঘোষণার পর থেকেই ক্রিকেটপাড়ায় আলোচনা আর কৌতূহলের শেষ নেই। কারণ একটাই—দলে নেই টেস্ট অধিনায়ক ও সাম্প্রতিক সময়ে ফর্মে থাকা ব্যাটার নাজমুল হোসেন শান্ত। তার বাদ পড়া শুধু বিস্ময় নয়, অনেক ভক্তের কাছে রীতিমতো ধাক্কা।
এই দলে নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছে লিটন দাসের হাতে। সহ-অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সাইফ হাসান। নতুন নেতৃত্ব, নতুন কম্বিনেশন আর কিছু চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ স্কোয়াড নিয়ে আগ্রহ তুঙ্গে।
বিশ্বকাপ স্কোয়াডে লিটন দাসের নেতৃত্ব: নতুন যুগের ইঙ্গিত
বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হিসেবে লিটন দাসের নাম ঘোষণার মধ্য দিয়েই পরিষ্কার, নির্বাচকরা ভবিষ্যতের দিকেই তাকিয়ে আছেন। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে লিটনের আগ্রাসী ব্যাটিং আর মাঠে শান্ত উপস্থিতি তাকে এই দায়িত্বের জন্য এগিয়ে রেখেছে।
সাইফ হাসানকে সহ-অধিনায়ক করাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ঘরোয়া ক্রিকেট ও বিপিএলে ধারাবাহিক পারফর্ম করে আসছেন। নেতৃত্বের ভার ভাগ করে দেওয়ায় দল আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নাজমুল হোসেন শান্ত কেন নেই? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
চলমান বিপিএলে নাজমুল হোসেন শান্ত যেন নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করছেন। ব্যাটে এসেছে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি, ইনিংসে ছিল আত্মবিশ্বাস আর পরিণত ভাব। তারপরও বিশ্বকাপের স্কোয়াডে তার নাম না থাকায় প্রশ্ন উঠছে নির্বাচকদের ভাবনায়।
অনেকে মনে করছেন, টি-টোয়েন্টির দ্রুতগতির খেলায় শান্তর স্ট্রাইক রেট হয়তো নির্বাচকদের পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেনি। আবার কেউ কেউ বলছেন, দল গঠনে একদম নির্দিষ্ট ভূমিকার খেলোয়াড় চেয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট। যাই হোক, শান্তর অনুপস্থিতি যে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
জাকের আলী অনিক ও রিপন মন্ডল বাদ: চমক কম নয়
শুধু শান্ত নন, আরও দুই নাম বাদ পড়েছে যাদের নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল। উইকেটরক্ষক ব্যাটার জাকের আলী অনিক সম্প্রতি ভালো পারফর্ম করলেও জায়গা পাননি। একইভাবে গতি আর আগ্রাসন দিয়ে নজর কাড়া পেসার রিপন মন্ডলও বাদ পড়েছেন।
এখানেই বোঝা যায়, নির্বাচকরা অভিজ্ঞতা আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পরীক্ষিত নামের দিকেই বেশি ঝুঁকেছেন। বড় মঞ্চে চাপ সামলানোই যে প্রধান বিবেচনা, সেটাই যেন স্পষ্ট।
বোলিং আক্রমণে জোর: পাঁচ পেসার, তিন স্পিনার
১৫ সদস্যের স্কোয়াডে পাঁচজন পেসার রাখার সিদ্ধান্ত বেশ সাহসী। মোস্তাফিজুর রহমান, তাসকিন আহমেদ, শরীফুল ইসলাম, তানজিম হাসান সাকিব ও সাইফুদ্দিন—এই পেস আক্রমণ যে কোনো দলের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
স্পিন বিভাগে আছেন মেহেদী হাসান, রিশাদ হোসেন ও নাসুম আহমেদ। ভারতীয় কন্ডিশন বিবেচনায় এই তিন স্পিনার ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। বিশেষ করে মাঝের ওভারে উইকেট তুলে নেওয়ার দায়িত্ব থাকবে তাদের কাঁধে।
ব্যাটিং লাইনআপ: তরুণ আর আগ্রাসনের মিশেল
ব্যাটিং বিভাগে নির্বাচকরা স্পষ্টভাবে আগ্রাসী ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকেছেন। তানজিদ হাসান তামিম, পারভেজ হোসেন ইমন আর তাওহিদ হৃদয়ের মতো তরুণদের ওপর বড় ভরসা রাখা হয়েছে।
নুরুল হাসান সোহান থাকছেন উইকেটের পেছনে, যিনি প্রয়োজনে দ্রুত রান তুলতে পারেন। শামীম হোসেনের অলরাউন্ড সামর্থ্যও দলের গভীরতা বাড়াবে। এই ব্যাটিং ইউনিট যদি শুরুটা ভালো করতে পারে, তাহলে বড় স্কোর গড়া অসম্ভব নয়।
বাংলাদেশের ম্যাচ সূচি: কোথায় কার বিপক্ষে খেলবে লাল-সবুজ
আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ঐতিহাসিক ইডেন গার্ডেন্সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে বাংলাদেশ। এই মাঠে এরপর ইতালি ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও খেলবে লিটন দাসের দল।
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নেপালের বিপক্ষে খেলতে বাংলাদেশ যাবে মুম্বাইয়ে। ভেন্যু আর প্রতিপক্ষ মিলিয়ে সূচি মোটেও সহজ নয়। তবে ভালো শুরু পেলে আত্মবিশ্বাস বাড়বে বহুগুণ।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬: বাংলাদেশের পূর্ণ স্কোয়াড
বাংলাদেশের ঘোষিত ১৫ সদস্যের বিশ্বকাপ দল হলো—
লিটন দাস (অধিনায়ক), সাইফ হাসান (সহ-অধিনায়ক), তানজিদ হাসান তামিম, পারভেজ হোসেন ইমন, তাওহিদ হৃদয়, শামীম হোসেন, নুরুল হাসান সোহান, মেহেদী হাসান, রিশাদ হোসেন, নাসুম আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান, তানজিম হাসান সাকিব, তাসকিন আহমেদ, সাইফুদ্দিন ও শরীফুল ইসলাম।
শেষ কথা: ঝুঁকি আছে, সম্ভাবনাও কম নয়
এই দল নিয়ে ঝুঁকি যে নেই, তা বলা যাবে না। শান্তর মতো একজন ফর্মে থাকা ব্যাটারকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তরুণদের ওপর আস্থা রাখার সাহসী মানসিকতাও চোখে পড়ছে।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট মানেই চমক, দ্রুত বদলে যাওয়া দৃশ্যপট। যদি লিটন দাসের নেতৃত্বে দল একসঙ্গে খেলতে পারে, তাহলে এই স্কোয়াড দিয়েই বাংলাদেশ বড় কিছু করে দেখাতে পারে—এই আশাই এখন কোটি ভক্তের।


