টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ নিয়ে ক্রিকেট দুনিয়ায় যে নাটক চলছিল, তার পর্দা নামল অবশেষে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আসন্ন বিশ্বকাপে বাংলাদেশ আর অংশ নিচ্ছে না। বাংলাদেশের জায়গায় খেলবে স্কটল্যান্ড। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি দল পরিবর্তনের খবর নয়। এর পেছনে আছে কূটনীতি, নিরাপত্তা বিতর্ক, বোর্ডের মতবিরোধ আর আইসিসির নীতিগত কঠোরতা।
ভারত ও শ্রীলঙ্কায় ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্টের আগে এমন সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে অনেকের মনে। কেন বাংলাদেশ বাদ পড়ল। কেনই বা সুযোগ পেল স্কটল্যান্ড। পুরো বিষয়টি সহজ করে বোঝার চেষ্টা করি।
কয়েক সপ্তাহ ধরেই ইঙ্গিত ছিল, পরিস্থিতি বাংলাদেশের পক্ষে যাচ্ছে না। আইসিসি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে ২৪ ঘণ্টার সময় দিয়েছিল নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার জন্য। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও বিসিবি আইসিসি বোর্ডের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। ফলাফল হিসেবে শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইসিসির সিইও সঞ্জোগ গুপ্ত বোর্ড সদস্যদের কাছে পাঠানো চিঠিতে স্পষ্ট করে বলেন, বিসিবির দাবি আইসিসির নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই নতুন করে কাউকে আমন্ত্রণ জানানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। এই চিঠির অনুলিপি বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামের কাছেও পাঠানো হয়।
মূল সমস্যা শুরু হয় ম্যাচ ভেন্যু নিয়ে। বাংলাদেশ চেয়েছিল, ভারতের মাটিতে তাদের ম্যাচগুলো অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হোক। নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা তুলে ধরে তারা এই দাবি করে। আইসিসি বিষয়টি হালকাভাবে নেয়নি। তারা নিজস্ব নিরাপত্তা মূল্যায়ন করে জানায়, ভারতে বাংলাদেশের জন্য হুমকির মাত্রা কম থেকে মাঝারি।
এই রিপোর্টে বিসিবি সন্তুষ্ট হয়নি। তাদের দাবি ছিল, ঝুঁকির মাত্রা আসলে মাঝারি থেকে বেশি। এখানেই তৈরি হয় বড় মতবিরোধ। আইসিসি বোর্ডের সভায় অধিকাংশ সদস্য বাংলাদেশের অনুরোধের বিপক্ষে ভোট দেন। তবুও বিসিবি অবস্থান বদলায়নি। এই অনড় মনোভাবই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
অনেকেই ভাবছেন, আইসিসি চাইলে একটু নমনীয় হতে পারত। কিন্তু সংস্থাটির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলাদা। আইসিসি পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, তারা এমন কোনো নজির তৈরি করতে চায় না যেখানে কোনো দেশ ভবিষ্যতে নিরাপত্তা বা অন্য অজুহাতে ম্যাচ স্থানান্তরের দাবি তুলবে।
বিশ্বকাপের সূচি আইসিসির কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একবার সূচি চূড়ান্ত হলে সেটি বদলানো মানে পুরো টুর্নামেন্ট ব্যবস্থাপনায় বড় ধাক্কা। তাই তারা সময় দিলেও শেষ পর্যন্ত নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে।
মজার বিষয় হলো, এর আগে বাংলাদেশ দল পাকিস্তানে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে গিয়েছিল, যেখানে নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা আরও বেশি ছিল। সেই উদাহরণও আইসিসির সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এখন প্রশ্ন আসে, কেন স্কটল্যান্ড। র্যাঙ্কিংয়ে তারা ১৪ নম্বরে। তবুও আইসিসি তাদেরই বেছে নিল। এর কারণ খুঁজলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক আইসিসি ইভেন্টগুলোতে স্কটল্যান্ড ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফরম্যান্স করেছে।
২০২৪ সালের বিশ্বকাপে তারা শক্তিশালী দলের সঙ্গে লড়াই করে গ্রুপে তৃতীয় হয়েছিল। ইংল্যান্ডের সঙ্গে সমান পয়েন্ট পেলেও নেট রান রেটে পিছিয়ে পড়ে। ২০২২ সালে তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে সবাইকে চমকে দেয়। এমনকি ২০২১ সালের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশকে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয়েছিল স্কটল্যান্ড।
এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই আইসিসির চোখে তাদের যোগ্য প্রমাণ করেছে।
বাংলাদেশের জায়গায় ঢুকে স্কটল্যান্ড পড়েছে গ্রুপ সি-তে। এই গ্রুপে তাদের সামনে বড় বড় চ্যালেঞ্জ। ৭ ফেব্রুয়ারি তারা খেলবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে। এরপর ইতালি ও ইংল্যান্ডের মতো দল অপেক্ষা করছে। কলকাতায় হবে বেশিরভাগ ম্যাচ। পরে মুম্বাইতে নেপালের বিরুদ্ধে খেলতে হবে তাদের।
এই সূচি মোটেও সহজ নয়। তবে স্কটল্যান্ডের সাম্প্রতিক আত্মবিশ্বাস দেখলে বলা যায়, তারা লড়াই করার জন্য প্রস্তুত।
বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বড় ধাক্কা। শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, ভাবমূর্তির দিক থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বমঞ্চে না থাকলে স্পনসর, সম্প্রচার আয় এবং খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা—সবকিছুতেই প্রভাব পড়ে।
একজন সাধারণ ভক্তের চোখে বিষয়টা এমন, বড় টুর্নামেন্ট মানেই উৎসব। সেখানে নিজের দল না থাকলে আগ্রহও কমে যায়। ক্রিকেটপ্রেমী দেশের জন্য এটি নিঃসন্দেহে হতাশার খবর।
এই ঘটনার পর বিসিবি ও আইসিসির সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে বিসিবিকে আরও কৌশলী হতে হবে। কূটনৈতিকভাবে বিষয় সামলানো, আইসিসির সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
অন্যদিকে, স্কটল্যান্ডের জন্য এটি সুবর্ণ সুযোগ। বিশ্বকাপে ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে পারলে সহযোগী দেশ থেকে পূর্ণ সদস্য হওয়ার স্বপ্ন আরও কাছে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ শুধু মাঠের লড়াই নয়, বোর্ডরুমের সিদ্ধান্তেও যে কতটা নাটকীয় হতে পারে, এই ঘটনাই তার বড় উদাহরণ। ক্রিকেট যে শুধু ব্যাট-বলের খেলা নয়, সেটি আবারও প্রমাণিত হলো।


