জুনে আসছে মহিলাদের টি-২০ বিশ্বকাপ। তার আগেই শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সিরিজ জিতে যেন বড় বার্তা দিল ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল। বলা যায়, বিশ্বকাপের আগে এর চেয়ে ভালো প্রস্তুতি আর হতে পারত না। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিরুদ্ধে তাদের ঘরের মাঠে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জয়—এটা শুধু একটা জয় নয়, এটা আত্মবিশ্বাসের বিস্ফোরণ।
এই সাফল্যের কেন্দ্রে ছিলেন অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর। তাঁর নেতৃত্বেই দল আরও পরিণত, আরও সাহসী। সাম্প্রতিক ম্যাচেই তিনি মহিলা ক্রিকেটে সর্বাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার নজির গড়েছেন। সেই মাইলফলকের পরই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে সিরিজ জেতা—এ যেন গল্পের মতো।
এই সফরকে ভারত শুধু সিরিজ হিসেবে নেয়নি। তারা এটাকে দেখেছে বিশ্বকাপের প্রস্তুতির বড় মঞ্চ হিসেবে। কারণ বিশ্বকাপে জিততে হলে অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্ত প্রতিপক্ষকে হারানোর মানসিকতা দরকার। আর সেই মানসিকতাই গড়ে তুলছে উইমেন ইন ব্লু।
তিন ম্যাচের সিরিজে প্রথম ম্যাচ জিতে ভারত এগিয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় ম্যাচে হেরে সিরিজ ১-১ হয়ে যায়। ফলে তৃতীয় ম্যাচটা হয়ে দাঁড়ায় কার্যত ফাইনাল। যে দল জিতবে, সেই দলই সিরিজের মালিক। এমন চাপের ম্যাচে নার্ভ সামলে জেতা—এটাই আসল পরীক্ষা।
নির্ণায়ক ম্যাচে টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। শুরুটা কিন্তু খুব ভালো হয়নি। ওপেনার শেফালি বর্মা দ্রুত আউট হয়ে গেলে একটু চিন্তা বাড়ে। তবে সেই চিন্তাকে একেবারে উড়িয়ে দেন স্মৃতি মন্ধানা।
স্মৃতি শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। কভার ড্রাইভ, পুল, স্ট্রেইট ড্রাইভ—প্রতিটি শট যেন বইয়ে লেখা। তাঁর সঙ্গে দারুণ সঙ্গ দেন জেমাইমা রডরিগেজ। দু’জনের বোঝাপড়া এতটাই মসৃণ ছিল, মনে হচ্ছিল নেট প্র্যাকটিস চলছে।
দু’জনে মিলে ১২১ রানের বড় জুটি গড়েন। স্মৃতি মাত্র ৫৫ বলে ৮২ রান করেন। তাঁর ইনিংসে ছিল ৮টি চার ও ৩টি ছক্কা। জেমাইমাও থামেননি। তিনি ৪৬ বলে করেন ৫৯ রান। এই জুটিই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
তুমি যদি ভাবো, টি-২০ ম্যাচে ১৭০-১৮০ রান খুব সাধারণ, তা হলে ভুল করবে। চাপের ম্যাচে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে, শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে এই রান তৈরি করা সহজ নয়।
মাঝে দ্রুত উইকেট পড়লেও রিচা ঘোষ ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। মাত্র ৭ বলে ১৮ রান। এই অতিরিক্ত রানগুলোই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয়। ২০ ওভারে ভারত তোলে ৬ উইকেটে ১৭৬ রান। লড়াইয়ের মতো স্কোর।
১৭৬ রান তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া শুরু থেকেই চাপে পড়ে। কারণ ভারতীয় বোলাররা শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিলেন। নতুন বলে রেণুকা সিং গতি ও সুইংয়ে ব্যাটারদের অস্বস্তিতে ফেলেন।
এই ম্যাচের আসল নায়িকা হয়ে ওঠেন শ্রেয়াঙ্কা পাতিল। তিনি ২২ রান দিয়ে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নেন। মাঝের ওভারে তাঁর স্পিন অস্ট্রেলিয়ার রান তোলার গতি কমিয়ে দেয়।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা বড় শট খেলতে গিয়ে ভুল করতে থাকেন। চাপ বাড়তে থাকে। শ্রেয়াঙ্কার নিয়ন্ত্রণ ও আত্মবিশ্বাস দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তিনি বড় মঞ্চের জন্য তৈরি।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে লড়াই করেন অ্যাশলি গার্ডনার। তিনি ৫৭ রান করেন। কিন্তু অন্য প্রান্তে কেউ টিকতে পারেননি। নিয়মিত উইকেট পড়তে থাকায় প্রয়োজনীয় রান রেট বেড়ে যায়।
শ্রী চরণীও ৩টি উইকেট নেন। অরুন্ধতী রেড্ডি ২টি এবং রেণুকা সিং ১টি উইকেট তুলে নেন। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া গুটিয়ে যায় ১৫৯ রানে। ভারত জিতে যায় ১৭ রানে।
এই সিরিজ জয় শুধু একটা ট্রফি নয়। এটা মানসিক শক্তির প্রমাণ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো মানে বড় পরীক্ষা পাস করা।
বিশ্বকাপের আগে দল বুঝে গেল—তারা পারে। স্মৃতি ফর্মে, জেমাইমা আত্মবিশ্বাসী, রিচা ফিনিশ করতে জানেন। বোলিং বিভাগেও আছে ভারসাম্য। স্পিন-ফাস্ট মিলিয়ে আক্রমণ সাজানো।
সবচেয়ে বড় কথা, নেতৃত্বে আছেন অভিজ্ঞ হরমনপ্রীত। তিনি জানেন কীভাবে চাপ সামলাতে হয়। তাঁর নেতৃত্বে দল আগেও বড় টুর্নামেন্টে ভালো করেছে। এবার লক্ষ্য একটাই—বিশ্বকাপ ট্রফি।
এই জয় প্রমাণ করে, ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট এখন আর আন্ডারডগ নয়। তারা এখন প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি। ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, তরুণ ও অভিজ্ঞদের মিশ্রণ—সব মিলিয়ে দল এখন ভারসাম্যপূর্ণ।
যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাহলে টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতকে হারানো সহজ হবে না। অস্ট্রেলিয়া সফরের এই সাফল্য তাই শুধু সিরিজ জয় নয়, এটা ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।
শেষ কথা একটাই—বিশ্বকাপের আগে ভারতীয় মহিলা দল যে আত্মবিশ্বাস পেয়েছে, সেটা অমূল্য। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, তারা এই ছন্দ বিশ্বমঞ্চে কতটা কাজে লাগাতে পারে।



