টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট মানেই উত্তেজনা, দ্রুত রান আর শেষ মুহূর্তের নাটক। আর যখন সেটা বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়, তখন চাপ ও প্রত্যাশা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এবারের ফাইনালে ভারত এমন এক বিশাল স্কোর দাঁড় করিয়েছে, যা জয়ের জন্য নিউজিল্যান্ডকে ইতিহাস গড়তে বাধ্য করবে। প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা জিততে হলে নিউজিল্যান্ডকে করতে হবে ২৫৬ রান।
২০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ভারত সংগ্রহ করেছে ২৫৫ রান। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালের ইতিহাসে এটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। অর্থাৎ ট্রফি জিততে হলে নিউজিল্যান্ডকে ভাঙতে হবে ফাইনালের সবচেয়ে বড় রান তাড়া করার রেকর্ড।
টস জিতে নিউজিল্যান্ড প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যে তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে, সেটা শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। ভারতের দুই ওপেনার শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন।
বিশেষ করে অভিষেক শর্মা যেন শুরু থেকেই ঝড় তোলেন। তার ব্যাটে ছিল আত্মবিশ্বাস আর আগ্রাসনের মিশেল। মাত্র ১৮ বলেই তিনি তুলে নেন ফিফটি, যা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের দ্রুততম অর্ধশতকগুলোর একটি।
এমন দ্রুত রান তোলার ফলে নিউজিল্যান্ডের বোলাররা শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায়। পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার আগেই ভারত তুলে নেয় ৯২ রান, যা এবারের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ পাওয়ার প্লে স্কোর।
এই ধরনের শুরু টি-টোয়েন্টি ম্যাচে পুরো খেলাটার গতি বদলে দেয়। ঠিক যেমন কোনো ফুটবল ম্যাচে শুরুতেই গোল হয়ে গেলে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি হয়।
এই ম্যাচে ভারতের ইনিংসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল অভিষেক শর্মার বিস্ফোরক ব্যাটিং।
তিনি যেন শুরু থেকেই ঠিক করে নেমেছিলেন যে বোলারদের এক মুহূর্তও শান্তিতে থাকতে দেবেন না। কভার ড্রাইভ, পুল শট আর লং-অন দিয়ে ছক্কা—সবকিছুতেই ছিল দারুণ আত্মবিশ্বাস।
১৮ বলে ফিফটি পূর্ণ করার পর তিনি ৫২ রান করে আউট হন। নিউজিল্যান্ডের অলরাউন্ডার রাচিন রবীন্দ্রর স্পিনে কাটা পড়েন তিনি। তবে তার আগেই দলকে এনে দিয়েছেন দুর্দান্ত একটি ভিত্তি।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এমন ইনিংসকে অনেক সময় “গেম-চেঞ্জিং” বলা হয়। কারণ শুরুতেই যদি রান দ্রুত আসে, তাহলে পরে অন্য ব্যাটারদের জন্য বড় স্কোর গড়া অনেক সহজ হয়ে যায়।
এই বিশ্বকাপে সাঞ্জু স্যামসন যেন একেবারে অন্য রূপে খেলছেন। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি ভারতের ব্যাটিং লাইনআপের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন।
ফাইনালেও তার ব্যাট থামেনি। টানা তৃতীয় ফিফটি তুলে নিয়ে আবারও প্রমাণ করেছেন নিজের দক্ষতা।
ওপেনিংয়ে নেমে তিনি খেলেন ৪৬ বলে ৮৯ রানের অসাধারণ ইনিংস। এই ইনিংসে ছিল বেশ কয়েকটি চমৎকার বাউন্ডারি ও ছক্কা। তার ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল তিনি পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।
ক্রিকেটে এমন ইনিংসকে বলা যায় “অ্যাঙ্কর ইনিংস”। যখন একজন ব্যাটার উইকেটে থেকে রান তুলতে থাকেন, তখন অন্য ব্যাটাররাও নির্ভার হয়ে খেলতে পারেন।
ভারতের ইনিংসের প্রথমার্ধ ছিল একেবারে দুর্দান্ত। প্রথম ১০ ওভারে তারা তোলে ১ উইকেটে ১২৭ রান।
এই সময়টা ছিল ভারতের পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মুহূর্ত। দ্রুত রান, কম উইকেট আর ধারাবাহিক বাউন্ডারি—সব মিলিয়ে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের জন্য সময়টা খুবই কঠিন হয়ে ওঠে।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে প্রথম ১০ ওভারকে অনেকেই ম্যাচের “ফাউন্ডেশন টাইম” বলে থাকেন। এই সময় যদি দল বড় রান তুলে নিতে পারে, তাহলে শেষ দিকে স্কোর ২০০–এর ওপরে নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।
ভারত ঠিক সেটাই করেছে।
যদিও ভারতের শুরুটা ছিল আগ্রাসী, শেষের দিকে কিছুটা চাপ তৈরি হয়।
শেষ ১০ ওভারে ভারত ৪ উইকেট হারায়। তবে রান থামেনি। এই সময় তারা তোলে ১২৮ রান।
অর্থাৎ উইকেট পড়লেও ব্যাটাররা রান তোলার গতি কমতে দেননি। আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এটাকেই বলা হয় “অ্যাটাকিং টেম্পো বজায় রাখা”।
বোলারদের ওপর চাপ ধরে রাখতে ভারত শেষ পর্যন্ত আক্রমণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে গেছে।
ভারতের ইনিংসের শেষ মুহূর্তে বড় ভূমিকা রাখেন শিবম দুবে। শেষ ওভারে তিনি একাই তুলে নেন ২৪ রান।
শেষ ওভারের এই রানগুলো ম্যাচে বড় পার্থক্য তৈরি করে দেয়। অনেক সময় ম্যাচের শেষে অতিরিক্ত ১৫–২০ রানই প্রতিপক্ষের জন্য লক্ষ্যকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে।
দুবের কয়েকটি শক্তিশালী ছক্কা ভারতের স্কোরকে ২৫৫ রানে পৌঁছে দেয়।
এই স্কোর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে এখন সর্বোচ্চ।
এখন পুরো চাপ নিউজিল্যান্ডের ওপর।
২৫৬ রান তাড়া করা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সব সময়ই কঠিন কাজ। তার ওপর সেটা যদি বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়, তাহলে চাপ আরও বেড়ে যায়।
নিউজিল্যান্ডকে জিততে হলে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করতে হবে। ওপেনারদের দ্রুত রান তুলতে হবে এবং মাঝের ব্যাটারদের দায়িত্ব নিতে হবে বড় ইনিংস খেলার।
ক্রিকেট ইতিহাসে বড় রান তাড়া করে জয়ের ঘটনা আছে। তবে ফাইনালে এমন বড় স্কোর তাড়া করা সত্যিই বিরল।
এই ম্যাচে দুটি সম্ভাবনা রয়েছে।
একদিকে ভারত চাইবে তাদের করা রেকর্ড স্কোর ধরে রেখে ট্রফি জিততে। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড চাইবে ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিততে।
যদি নিউজিল্যান্ড এই লক্ষ্য তাড়া করে জিতে যায়, তাহলে সেটি হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রান তাড়া করে জয়।
ক্রিকেট ভক্তদের জন্য এমন ম্যাচ সত্যিই দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সৌন্দর্যই হলো এর অনিশ্চয়তা। কখন ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়, তা কেউ আগে থেকে বলতে পারে না।
ভারত ২৫৫ রান করে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু নিউজিল্যান্ড যদি শুরুটা ভালো করতে পারে, তাহলে ম্যাচে রোমাঞ্চকর লড়াই দেখা যেতে পারে।
এখন দেখার বিষয়—নিউজিল্যান্ড কি এই বিশাল লক্ষ্য তাড়া করে ইতিহাস গড়তে পারে, নাকি ভারত তাদের রেকর্ড স্কোর রক্ষা করে আবারও বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ভাসবে।
ক্রিকেটপ্রেমীরা অপেক্ষা করছেন এই ফাইনালের শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তার জন্য।



