মাঝে মাঝে খেলাধুলার বাইরের ঘটনাও খেলাকে বড়ভাবে প্রভাবিত করে। এবার ঠিক তেমনটাই হলো। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শেষে তিন দেশের ক্রিকেটারদের দেশে ফেরাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটাররা টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পরও নিজ নিজ দেশে ফিরতে পারছিলেন না।
অবশেষে সেই দুশ্চিন্তার অবসান ঘটিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা বিশেষ চার্টার্ড বিমানের ব্যবস্থা করেছে। ফলে কয়েকদিনের অপেক্ষা আর উদ্বেগের পর এবার স্বস্তির হাসি ফুটেছে ক্রিকেটারদের মুখে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলেও প্রভাব ফেলেছে। অনেক ফ্লাইট বাতিল বা অনিশ্চিত হয়ে যায়। সেই কারণেই টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পরও তিনটি দলের ক্রিকেটাররা দেশে ফিরতে পারেননি।
বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের অবস্থা ছিল বেশ বিব্রতকর। কয়েকদিন ধরে কলকাতায় আটকে ছিলেন তারা। এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগও প্রকাশ করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান কোচ ড্যারেন স্যামি।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট করে জানান, তাদের দল ছয় দিন ধরে আটকে আছে। বিষয়টি দ্রুত সমাধানের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এই ঘটনার মাঝেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনার আকিল হোসেন একটু মজার ভঙ্গিতে একটি অনুরোধ করেছিলেন। তিনি ফুটবল সুপারস্টার ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর কাছে অনুরোধ করেন যেন তিনি ৭০০ কোটি টাকার একটি ব্যক্তিগত বিমান পাঠিয়ে তাদের দেশে ফিরিয়ে দেন।
যদিও সেটি ছিল মজার ছলে বলা কথা, কিন্তু ঘটনাটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। অনেক ক্রিকেট ভক্ত বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য সমস্যার সমাধান আসে আইসিসির উদ্যোগেই।
এক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ওয়েবসাইটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিসি তিনটি দলের জন্য বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছে।
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী—
- ইংল্যান্ড দল শনিবার সন্ধ্যায় মুম্বই থেকে একটি চার্টার্ড বিমানে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা দেবে।
- ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকা দল কলকাতা থেকে আরেকটি চার্টার্ড ফ্লাইটে নিজ নিজ দেশে ফিরবে।
এই ব্যবস্থার ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো ক্রিকেটারদের।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকা—দুই দলই নিজেদের শেষ ম্যাচ খেলেছিল কলকাতার ঐতিহাসিক ইডেন গার্ডেন্সে।
সুপার এইট পর্বের শেষ ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে ভারত। অন্যদিকে সেমিফাইনালে কলকাতায় মুখোমুখি হয়েছিল নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা।
সে ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা হেরে যায়। সেই ম্যাচের পর থেকেই দুই দল কলকাতায় অবস্থান করছিল।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট অনিশ্চিত হওয়ায় তারা কয়েকদিন ধরে সেখানেই আটকে ছিল।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোচ ড্যারেন স্যামি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট করেছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন “Day Six” বা “ছয় নম্বর দিন”।
এই পোস্টের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে তাদের দল ছয় দিন ধরে কলকাতায় আটকে রয়েছে। এই পোস্টের পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলেও আলোচনায় আসে।
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন—বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া দলগুলোর জন্য আগেই কি বিকল্প পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল না?
চার্টার্ড ফ্লাইটের মাধ্যমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার তারকা পেসার কাগিসো রাবাডাও দেশে ফিরবেন।
জানা গেছে, রবিবার একটি বিশেষ ফ্লাইটে দুই দল রওনা দেবে।
এই ফ্লাইটটি প্রথমে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে যাবে। সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটাররা নেমে যাবেন। এরপর একই বিমান ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের ক্রিকেটারদের নিয়ে অ্যান্টিগায় পৌঁছাবে।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকার সব ক্রিকেটারই সরাসরি দেশে ফিরবেন না।
কেশব মহারাজ, জর্জ লিন্ডে এবং জেসন স্মিথসহ কয়েকজন ক্রিকেটার দলের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডে যাবেন।
কারণ সামনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ।
১৫ মার্চ থেকে শুরু হবে নিউজিল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে পাঁচ ম্যাচের টি–টোয়েন্টি সিরিজ।
এই সিরিজের জন্য কিছু ক্রিকেটার সরাসরি নিউজিল্যান্ডে যাবেন। টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গেই তারা সেখানে যোগ দেবেন।
এতে করে সময়ও বাঁচবে এবং সিরিজের প্রস্তুতিও সহজ হবে।
ইংল্যান্ড দলের ক্ষেত্রে পরিকল্পনাটা একটু আলাদা।
তারা মুম্বই থেকে সরাসরি চার্টার্ড বিমানে লন্ডনের উদ্দেশে উড়ে যাবে। ফলে তাদের আর কোথাও ট্রানজিট করতে হবে না।
দীর্ঘ টুর্নামেন্ট শেষে দ্রুত দেশে ফিরতে পারায় ইংলিশ ক্রিকেটাররাও স্বস্তি পাচ্ছেন।
খেলাধুলা কখনও কখনও বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব থেকেও মুক্ত থাকে না। এবার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি তার বড় উদাহরণ।
কিন্তু আইসিসির দ্রুত পদক্ষেপের কারণে বড় ধরনের জটিলতা এড়ানো গেছে।
কয়েকদিনের অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার পর অবশেষে তিন দেশের ক্রিকেটাররা নিরাপদে দেশে ফিরতে পারছেন।
এখন তাদের সামনে নতুন সিরিজ, নতুন প্রস্তুতি এবং আবারও ক্রিকেট মাঠে ফেরার অপেক্ষা।



