ভারতীয় ক্রিকেটে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা শুধু ম্যাচ জেতায় না, ইতিহাসও গড়ে দেয়। এমনই এক রাতের সাক্ষী রইল ক্রিকেট বিশ্ব। সঞ্জু স্যামসন-এর অপরাজিত ৯৭ রানের ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে গেল ভারত। ম্যাচ শেষে আবেগ সামলাতে না পেরে অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব-কে জড়িয়ে ধরে সঞ্জুর বলা একটি বাক্য এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে— “রুলায়েগা ক্যায়া পাগলে?”
এই ম্যাচের আগে চাপ ছিল প্রবল। বড় রান তাড়া, নকআউটের টিকিট ঝুলে আছে এক ইনিংসের উপর। এমন অবস্থায় যে ব্যাটার দায়িত্ব নেয়, তাকেই বলে ম্যাচ উইনার। শুরুটা ধীরে করলেও সঞ্জু বুঝে নিয়েছিলেন পরিস্থিতি। বাউন্ডারি খোঁজার আগে উইকেটের দাম দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি।
৫০ বলে ৯৭ রানের এই ইনিংস শুধু পরিসংখ্যান নয়, মানসিক দৃঢ়তার উদাহরণ। একের পর এক নিখুঁত শট, বুদ্ধিদীপ্ত স্ট্রাইক রোটেশন আর শেষ দিকে আগ্রাসী ব্যাটিং—সব মিলিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোলারদের সামনে কার্যত অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন সঞ্জু।
ম্যাচ শেষ হতেই আবেগে ভেসে যান সঞ্জু। ড্রেসিংরুমে ফেরার পথে টুপি খুলে তাঁকে কুর্নিশ জানান অধিনায়ক সূর্যকুমার। সেই মুহূর্তে সঞ্জু জড়িয়ে ধরেন ক্যাপ্টেনকে। মুখের কাছে এসে বলেন, “রুলায়েগা ক্যায়া পাগলে?”—মানে, কাঁদাবি নাকি পাগল?
এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা, না বলা কষ্ট আর প্রমাণ করার তৃপ্তি। উত্তরে সূর্য বলেন, “অনেক কিছু বলার ছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে কী বলব, বুঝতে পারছি না।” এই সংলাপই এখন ভাইরাল ভিডিওর প্রাণ।
এক সময় দলে সঞ্জুর জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। অভিষেক বা তিলকের মতো তরুণদের খেলানো নিয়ে আলোচনা চলেছিল জোরকদমে। এমনকি অধিনায়কেরও আপত্তি ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু ক্রিকেট কখনও শুধু পরিকল্পনায় চলে না, চলে পারফরম্যান্সে।
এই ম্যাচেই সেই সঞ্জুই হয়ে উঠলেন ত্রাতা। সূর্যকুমার ম্যাচের পর স্পষ্ট বলেন, “আমি সবসময় বিশ্বাস করি, ভালো মানুষদের সঙ্গে ভালোই হয়। তবে তার জন্য ধৈর্য ধরতে হয়।” তিনি জানান, সুযোগ না পেলেও সঞ্জু নিয়মিত পরিশ্রম চালিয়ে গিয়েছেন। সঠিক সময়েই তার ফল পেয়েছেন।
সঞ্জুর কেরিয়ার উত্থান-পতনে ভরা। নিজের পছন্দের ব্যাটিং পজিশন হারানো, ভিন্ন জায়গায় নামা, এমনকি দল থেকে বাদ পড়াও দেখতে হয়েছে। কিন্তু তিনি থামেননি। আবার ফিরে এসেছেন নিজের জায়গায়, নিজের স্টাইলে।
সূর্যকুমার বলেন, “সাহসীরাই ম্যাচ জেতায়। সঞ্জু সেটাই করেছে।” এই বক্তব্য শুধু প্রশংসা নয়, বরং এক ক্রিকেটারের মানসিক জয়ের স্বীকৃতি।
ম্যাচ জেতার পর মাঠেই বসে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানান সঞ্জু। সাজঘরে ফিরে নিজের ব্যাটে চুম্বন করেন। এই দৃশ্যই বুঝিয়ে দেয়, ইনিংসটা তাঁর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি ছিল শুধু একটি ম্যাচ নয়, নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার লড়াই।
এই ইনিংসের হাত ধরেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় রান তাড়ার নতুন নজির গড়েছে টিম ইন্ডিয়া। এমন কৃতিত্ব ক্রিকেট ইতিহাসে বিরল।
এই জয়ের ফলে ষষ্ঠবারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠল ভারত। শেষ চারের লড়াইয়ে ভারতের সামনে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। ম্যাচটি ঘিরে ইতিমধ্যেই উত্তেজনা তুঙ্গে।
সঞ্জুর ফর্ম ভারতকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে। বড় ম্যাচের আগে এমন এক ইনিংস গোটা দলের মনোবল কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই ইনিংসের গুরুত্ব শুধু রানসংখ্যায় নয়। চাপের মুখে দায়িত্ব নেওয়া, সমালোচনার জবাব ব্যাটে দেওয়া আর দলের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়া—এই তিনটি কারণেই সঞ্জুর ৯৭ রান বিশেষ।
ভারতীয় ক্রিকেটে অনেক বড় ইনিংস এসেছে। কিন্তু কিছু ইনিংস থাকে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখে। সঞ্জু স্যামসনের এই ইনিংস তেমনই এক অধ্যায়, যা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
সেমিফাইনাল ও ফাইনাল—দুটি ম্যাচেই ভারতের ভরসা ব্যাটিং ইউনিট। সঞ্জুর কাছ থেকে আবারও এমন পারফরম্যান্স আশা করছেন সমর্থকরা। অধিনায়কও আশাবাদী, পরের ম্যাচগুলোতেও তিনি একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন।
একটা ইনিংস কীভাবে একজন খেলোয়াড়ের গল্প বদলে দিতে পারে, সঞ্জু স্যামসন তার জীবন্ত উদাহরণ। আর সেই গল্পের শুরুটা হয়েছিল একটি প্রশ্ন দিয়ে—“রুলায়েগা ক্যায়া পাগলে?”



