নামিবিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচটা কাগজে-কলমে যতটা সহজ মনে হচ্ছিল, মাঠে নেমে ঠিক ততটাই কঠিন হয়ে দাঁড়াল ভারতের জন্য। শুরুতে ঝড়ো ব্যাটিং দেখে মনে হয়েছিল রানের পাহাড় গড়বে মেন ইন ব্লু। কিন্তু মাঝপথে আচমকা ছন্দপতন। শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেট হারিয়ে ২০৯ রান তুললেও ভারতীয় ব্যাটিং লাইন আপ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল।
এই ম্যাচটা ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বড় লড়াইয়ের আগে একরকম প্রস্তুতি পর্ব। তাই প্রত্যাশাও ছিল বেশি। কিন্তু ম্যাচের চিত্র বলছে, ভারতের ব্যাটিং এখনো পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হওয়ার মতো জায়গায় পৌঁছয়নি।
ম্যাচের শুরুটা ছিল একেবারে আগুন ঝরানো। ওপেন করতে নেমে সঞ্জু স্যামসন শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলেন। মাত্র ৮ বলে ২২ রান করে তিনি পরিষ্কার বার্তা দেন—আজ বড় স্কোরের লক্ষ্যেই নামছে ভারত। অপর প্রান্তে ঈশান কিষান ছিলেন আরও ভয়ংকর। ২৪ বলে ৬১ রান, ছয়টি চার আর পাঁচটি ছক্কা—বল যেন ব্যাটে লেগেই সীমানা পেরোচ্ছিল।
পাওয়ার প্লে শেষ হতে না হতেই ভারতের স্কোর ৮৬। তখন মনে হচ্ছিল ২৫০ রানও হয়তো খুব দূরে নয়। দর্শকরাও যেন বড় কিছু দেখার অপেক্ষায় ছিলেন।
কিন্তু ক্রিকেটে গতি বদলাতে সময় লাগে না। ঈশান অতিরিক্ত আগ্রাসী হতে গিয়ে উইকেট ছুঁড়ে দেন। আর সেখান থেকেই শুরু ভারতের ধস।
ঈশানের আউটের পর ভারতীয় ব্যাটিং লাইন আপ যেন হঠাৎ করে থমকে যায়। তিলক বর্মা ২১ বলে ২৫ রান করলেও ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো ছন্দে ছিলেন না। অন্যদিকে অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব, যিনি আগের ম্যাচে দলকে জিতিয়েছিলেন, এদিন মাত্র ১৩ বলে ১২ রান করে ফেরেন।
এখানেই স্পষ্ট হয় ভারতের সমস্যাটা। শুরুর ঝড়ের পর ইনিংস ধরে রাখার মতো স্থিরতা দেখা গেল না। যেন গাড়ি খুব দ্রুতগতিতে চলছিল, কিন্তু হঠাৎ ব্রেক কষতেই ভারসাম্য হারাল।
ম্যাচ যখন একটু অনিশ্চিত হয়ে উঠছিল, তখন হার্দিক পান্ডিয়া দায়িত্ব নেন। ২৮ বলে ৫২ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলেন তিনি। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল শক্তি, আত্মবিশ্বাস আর সঠিক সময়ে আক্রমণ। শেষ দিকে তাঁর কয়েকটি বড় শট ভারতের স্কোরকে ২০০ পার করতে সাহায্য করে।
তবে ইনিংসের শেষ দুই ওভারে আবারও দেখা যায় অস্থিরতা। দ্রুত রান তুলতে গিয়ে শিবম দুবে রান আউট হন। অক্ষর প্যাটেলও প্রথম বলেই আউট হয়ে যান। ফলে ভারত ২০৯ রানে থামে, কিন্তু ৯ উইকেট হারানোর ঘটনা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শুরুর ওভারগুলোতে নামিবিয়ার বোলারদের বেশ চাপে দেখা গেলেও তারা দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। বিশেষ করে গেরহার্ড এরাসমাস ছিলেন অসাধারণ। চার ওভারে মাত্র ২০ রান দিয়ে চারটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নেন তিনি। ঈশান কিষান ও তিলক বর্মার মতো ব্যাটারদের ফেরান নিজের দক্ষতায়।
এছাড়া বেন শিকোঙ্গো, জে স্মিট এবং বার্নার্ড শোলৎজ প্রত্যেকে একটি করে উইকেট নেন। তাদের লাইন-লেন্থ ছিল নিয়ন্ত্রিত, আর ফিল্ডিংও ছিল ঝরঝরে। শুরুতে যে ম্যাচটা ভারতের একতরফা মনে হচ্ছিল, সেটাকেই তারা প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে।
এই ম্যাচে ২০০ পেরোলেও সমস্যাটা চোখে পড়ার মতো। শুধু নামিবিয়া নয়, এর আগে আমেরিকার বিরুদ্ধেও ভারতীয় ব্যাটিংকে নড়বড়ে দেখিয়েছে। টপ অর্ডার ভালো শুরু দিলেও মিডল অর্ডারের ধারাবাহিকতা নেই।
বড় টুর্নামেন্টে এই ধরনের ওঠানামা বিপজ্জনক হতে পারে।
ভাবো তো, যদি শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের সামনে এমন ধস নামে, তখন পরিস্থিতি কতটা কঠিন হবে। পাকিস্তানের মতো দলের বিরুদ্ধে সামান্য ভুলও বড় মূল্য চুকাতে হতে পারে।
এই ম্যাচটাকে অনেকেই ড্রেস রিহার্সাল বলছিলেন। সেই দিক থেকে দেখলে কিছু ইতিবাচক দিক অবশ্যই আছে—পাওয়ার প্লেতে আগ্রাসী শুরু, হার্দিকের ফিনিশিং ক্ষমতা। কিন্তু একই সঙ্গে রয়েছে উদ্বেগ—মাঝের ওভারে ধারাবাহিকতার অভাব, অপ্রয়োজনীয় উইকেট হারানো, এবং চাপের মুহূর্তে স্থিরতার ঘাটতি।
টুর্নামেন্ট যত এগোবে, প্রতিপক্ষ তত কঠিন হবে। তাই এখনই ভুলগুলো ঠিক না করলে ভবিষ্যতে সমস্যা বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে ম্যাচটা ছিল শিক্ষণীয়। ভারত ২০৯ রান করেছে, যা সম্মানজনক স্কোর। কিন্তু ৯ উইকেট হারিয়ে সেই রান তোলা একেবারেই নিশ্চিন্ত হওয়ার মতো নয়। নামিবিয়া প্রমাণ করেছে, ছোট দল বলে কাউকে হালকাভাবে নিলে বিপদ হতে পারে।
ভারতীয় দলের জন্য এটা এক ধরনের সতর্কবার্তা। শুরুটা যতই ঝলমলে হোক, শেষটা শক্তপোক্ত না হলে বড় ম্যাচে সফল হওয়া কঠিন। এখন দেখার, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে তারা এই অভিজ্ঞতা থেকে কতটা শিক্ষা নেয়।


