যশোর জেলার বসুন্দিয়া বাজার থেকে অল্প পথ অতিক্রম করলেই ভৈরব নদ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় এক নিস্তব্ধ অথচ ঐতিহাসিক গ্রামে—শেখহাটি। সময়ের করাল গ্রাসে আজ যার নাম হারিয়ে যেতে বসেছে, একসময় সেটিই ছিল বাণিজ্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দু। বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইতিহাসে শেখহাটি ছিল এক উজ্জ্বল দীপ্তি, যা আজ শুধুই নীরব সাক্ষ্যবাহী ধ্বংসাবশেষ।
ভৈরব নদ ও শেখহাটির প্রাচীন সম্পর্ক
ভৈরব নদ, যাকে নিয়ে একসময় গর্ব করত দক্ষিণ বঙ্গ, আজ তার প্রবাহে অতীতের সেই গর্জন আর নেই। তবুও ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যায়—ভৈরব ছিল বাংলার তিন প্রাচীন নদীর অন্যতম: গঙ্গা, সরস্বতী এবং ভৈরব। এই ত্রিধারা ছিল বাণিজ্য ও সংস্কৃতির স্নায়ুতন্ত্র। দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যে এই নদীর কূলে গড়ে উঠেছিল বহু জনপদ, যার মধ্যে অন্যতম ছিল শাঁখহাটী—বর্তমান শেখহাটি।
এই নামের রূপান্তর ঘটেছে বহুবার—শাঁখহাটী, শাহত্য, শঙ্খহাটী—সবগুলোই একটিই জনপদের নামান্তর। এই অঞ্চলই ছিল বকদ্বীপ রাজ্যের অংশ, পরবর্তীকালে পরিচিতি পায় বগদী কিংবা বাগড়ী নামে।
শেখহাটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব
পাল রাজবংশ ও সেন বংশ—দুই রাজবংশের শাসনকালেই শেখহাটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নেয়। “দিগ্বিজয় প্রকাশ” নামক প্রাচীন গ্রন্থে বর্ণিত বাগড়ী সীমারেখা ও শাসনব্যবস্থা অনুযায়ী শেখহাটি ছিল প্রশাসনিক এবং সামরিক দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
এখানে বাস করতেন এক রহস্যময় শাসক—পাতাল ভেদী রাজা। তাঁর নাম ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেলেও, নয়াবাড়ী গ্রামের ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদ আজও তাঁর অস্তিত্বের নিঃশব্দ সাক্ষ্য বহন করে। কথিত আছে, তিনি মাটির নিচে সুড়ঙ্গ কেটে গোপন প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন, যার কিছু নিদর্শন আজও ধরা দেয় প্রাচীন ইটের স্তূপে।
বল্লাল সেন ও শেখহাটির রাজধানী গৌরব
সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন, যিনি পূর্ব বাংলাকে আরও সংগঠিত করেছিলেন, শেখহাটিকে পরিণত করেন বাগড়ী প্রদেশের রাজধানী হিসেবে। তাঁর শাসনামলে এই জনপদ লাভ করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত স্বীকৃতি। শেখহাটির চারপাশে গড়ে ওঠে অধুনা হারিয়ে যাওয়া বন্দর, সেনা ছাউনির ধ্বংসাবশেষ, রাজদরবারের স্থাপত্য।
লক্ষ্মণ সেন, বল্লাল সেনের পুত্র, শেখহাটিতে দীর্ঘ সময় কাটান। এই সময়েই সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটে। তাঁর পূর্বপুরুষ বিজয় সেনের বাসস্থান ছিল শেখহাটির পাশ্ববর্তী দেবভোগ গ্রামে, যেখানে আজও পাওয়া যায় “বিজয়লতা” নামক স্মৃতি চিহ্ন।
বখতিয়ার খিলজীর আগমনে শেখহাটির রূপান্তর
সেন বংশের রাজত্বকাল হঠাৎ করেই বিপর্যস্ত হয় মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর আকস্মিক আক্রমণে। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে নদীয়ার পতনের পর লক্ষ্মণ সেন প্রাণভয়ে আশ্রয় নেন তাঁর পরিচিত অঞ্চলে—শেখহাটি, সেই সময়কার বাগড়ী রাজধানীতে।
এই সময় থেকেই শেখহাটি হয়ে ওঠে বাংলার মধ্যযুগীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নীরব সাক্ষী। এখানেই আশ্রয় নেন পরাজিত রাজা, গড়ে তোলেন শেষ প্রতিরোধের দুর্গ। যদিও শেষরক্ষা হয়নি, কিন্তু শেখহাটি হয়ে ওঠে বাংলার স্বর্ণযুগের শেষ কণ্ঠস্বর।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জনকথা
শেখহাটি শুধু রাজনীতির কেন্দ্র নয়, ছিল কবিতা, গীত, কাহিনির উৎসভূমি। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, এখানেই রাজসভার কবিদের বাস ছিল, যাঁরা সেন রাজাদের বীরত্বগাথা রচনা করতেন।
শেখহাটির গ্রামীণ এলাকায় এখনো প্রচলিত আছে পাতাল ভেদী রাজার গাথা, বখতিয়ার খিলজীর অশ্বারোহীদের গর্জন, বিজয় সেনের রাজপ্রাসাদের কাহিনি। ভৈরব নদীর জলে এখন আর প্রবাহ নেই, কিন্তু তার কূলে বাতাসে ভেসে বেড়ায় শতাব্দী পুরনো ইতিহাসের সুর।

দর্শনার্থীদের জন্য শেখহাটির আকর্ষণ
যাঁরা ইতিহাস, পুরাকীর্তি ও রহস্য ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য শেখহাটি এক আদর্শ গন্তব্য। এখানে রয়েছে:
- নয়াবাড়ী গ্রামের ধ্বংসাবশেষ – পাতাল ভেদী রাজার স্মৃতি বহনকারী প্রাচীন প্রাসাদ
- দেবভোগ গ্রামের বিজয় সেন স্মৃতি – বিজয়লতা এবং পূর্ব সেন রাজাদের আবাসস্থল
- ভৈরব নদীর শান্ত কূলে হাঁটা – যেখানে প্রতিটি ঢেউ যেন বলে যায় এক গল্প
- গ্রামীণ মানুষের স্মৃতিচারণা – যাঁদের কথায় মিশে থাকে রাজন্যবর্গের ইতিহাস
একটি দিনের সফরে এই সমস্ত স্থান ঘুরে দেখা যায়। তবু প্রতিটি স্থানেই সময় নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দাঁড়ালে ইতিহাসের চাপা পাতা যেন একে একে খুলে যায়।
আজকের শেখহাটি: অতীতের ছায়ায় বর্তমান
আজকের শেখহাটি যেন একটি জীবন্ত জাদুঘর। আধুনিকতা ছুঁয়ে গেলেও, এখনও আছে প্রাচীন কীর্তির নিদর্শন, মুখে মুখে ইতিহাস, এবং অবিকৃত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। গবেষক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এটি গবেষণার খনি, আর সাধারণ দর্শকদের কাছে আবিষ্কারের আনন্দময় অভিজ্ঞতা।
শেখহাটি—ইতিহাসের নিরব কাব্য
আমরা যখন শেখহাটির মাটি স্পর্শ করি, তখন শুধু একটি গ্রামের নয়, বরং একটি হারিয়ে যাওয়া নগর সভ্যতার গর্বিত ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখি। এটি কেবল একদিনের ভ্রমণ নয়, বরং সময়ের অলিন্দ দিয়ে ফিরে দেখা এক অতীত। ইতিহাসের সবটুকু হয়তো জানা যায় না, তবু শেখহাটি সেই হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠা আমাদের হাতে তুলে দেয়।
যাঁরা বাংলার অতীত খুঁজে পেতে চান, তাঁদের জন্য শেখহাটি হতে পারে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
✍️ তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ৭ আগস্ট ২০২৫


