বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রকৃতি যেমন মনোরম, তেমনি এখানে মানুষের জীবন-জীবিকাও প্রকৃতির সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত হলো ঝালকাঠির ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা হাট। আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত তিন মাসব্যাপী এই হাট যেন বাংলার গ্রামীণ জীবনের প্রাণচিত্র হয়ে ওঠে।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নের ভীমরুলী গ্রামে বসে দেশের সবচেয়ে বড় ভাসমান পেয়ারা হাট। খাল-বিলের বুকে নৌকায় ভাসমান এই হাট প্রতিদিনই জমে ওঠে। এখানে নৌকায় বোঝাই সবুজ পেয়ারা আসে স্থানীয় বাগান থেকে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে বিক্রি-বিক্রি, দরদাম আর মানুষের কোলাহল।
বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর—এই তিন জেলায় প্রায় ৫৫টি গ্রামজুড়ে পেয়ারা বাগান বিস্তৃত। স্থানীয়দের কাছে পেয়ারা শুধু একটি ফল নয়; বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জীবিকার প্রধান উৎস। মৌসুমে প্রতিদিন এখানে কয়েক হাজার মণ পেয়ারা বিক্রি হয়। পাইকার, খুচরা ব্যবসায়ী, পর্যটক ও স্থানীয় কৃষক—সবাই একসঙ্গে এই বাজারকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
খাল-বিলের বুকজুড়ে ছুটে চলা নৌকা, তার ওপর বোঝাই পেয়ারা, বিক্রেতাদের হাঁকডাক আর ক্রেতাদের দরদাম—সব মিলিয়ে এক বিরল উৎসবের আবহ সৃষ্টি করে। দূর থেকে এ দৃশ্য দেখলে মনে হয় যেন পানির ওপর ভেসে থাকা এক সবুজের মহাসমারোহ।
ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা হাট শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র নয়, বরং দেশি-বিদেশি ভ্রমণকারীদের জন্যও অন্যতম আকর্ষণ। খালের বুকজুড়ে নৌকায় ভাসতে ভাসতে পর্যটকেরা মুগ্ধ হয়ে যান প্রকৃতির সৌন্দর্যে।
শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিনে দুই শতাধিক ট্রলারভর্তি পর্যটক খালে ভিড়ে। তখন ভীমরুলীর বিল যেন এক মহাসমারোহের মঞ্চ হয়ে ওঠে।
এই হাটের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন অনেক বিদেশি কূটনীতিক ও পর্যটক। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট আল মিনার ও ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধণ শৃঙ্গলা—তাঁরাও এসেছিলেন ভীমরুলীর সৌন্দর্য দেখতে। এতে শুধু বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনাই নয়, বরং আন্তর্জাতিকভাবে এই অঞ্চলটির পরিচিতি বৃদ্ধি পেয়েছে।
আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাস—এই তিন মাসেই ভাসমান পেয়ারা হাটে প্রাণ ফিরে আসে। বর্ষার পানিতে খাল-বিল যখন পূর্ণ থাকে, তখন নৌকায় চড়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। তাই এই মৌসুমেই ভাসমান বাজারের আসল রূপ দেখা যায়।
প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে হাটের ব্যস্ততা। নৌকাভর্তি পেয়ারা, দরদামের শব্দ, বাজারে পর্যটকদের কোলাহল—সব মিলিয়ে ভীমরুলী হয়ে ওঠে এক জীবন্ত উৎসবের মঞ্চ।
যারা ভীমরুলীর ভাসমান হাটে ঘুরতে যেতে চান, তাঁদের জন্য সবচেয়ে ভালো সময় হলো আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস। এ সময় খাল-বিল ভরা থাকে পানিতে, আর প্রতিদিন বসে পেয়ারা হাট।সকালে তাড়াতাড়ি গেলে হাটের আসল রূপ দেখা যায়।স্থানীয় নৌকায় চড়ে খালের বুকজুড়ে ভ্রমণ করলে পাওয়া যায় এক অনন্য অভিজ্ঞতা।শুধু পেয়ারা নয়, এখানে আরও পাওয়া যায় কদবেল, নারকেল, লেবু, পেঁপেসহ নানা দেশি ফল।পর্যটকদের জন্য স্থানীয়রা নৌকা ভাড়া দেয়, আবার অনেক জায়গায় খাবারের ব্যবস্থাও থাকে।

ভীমরুলীর ভাসমান হাট শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং গ্রামীণ সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্কেরও প্রতিচ্ছবি। কৃষকেরা যেমন তাদের ফল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তেমনি এখানে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও মিলনমেলার আবহ সৃষ্টি হয়।
প্রতিবছর লাখো মানুষ এই ভাসমান হাট দেখতে আসে। ফলে স্থানীয় পর্যটন শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। অনেকেই স্থানীয় গাইড, নৌকা চালক, খাবারের দোকানদার বা হোটেল ব্যবসায়ী হয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভাসমান পেয়ারা হাট।খাল-বিলজুড়ে পানির ওপর ভেসে থাকা নৌকার বাজার বিশ্বে বিরল।এখানে একসঙ্গে মেলে প্রকৃতি, কৃষি ও পর্যটনের অনন্য সমন্বয়।দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণে এটি এখন বাংলাদেশের অন্যতম ট্রাভেল ডেস্টিনেশন।
ঝালকাঠির ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা হাট হলো বাংলার প্রকৃতির বুকজুড়ে আঁকা এক অনন্য মায়াবী দৃশ্য। এখানে এসে শুধু ফল কেনা বা বিক্রিই নয়, বরং উপভোগ করা যায় প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশ সত্যিই এক অপার সৌন্দর্যের দেশ, যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের জীবিকা মিশে গেছে এক অদ্ভুত সুরে।
যদি কখনো শহরের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে প্রকৃতির আসল রূপ দেখতে চান, তবে ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা হাটই হতে পারে আপনার পরবর্তী গন্তব্য।
✍️ তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১৬ আগস্ট ২০২৫


