বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ঝালকাঠি জেলা এমন এক বিস্ময়কর সৌন্দর্যের আধার, যেখানে প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাস মিলে তৈরি করেছে অনন্য বৈচিত্র্য। একদিকে রয়েছে ভিমরুলীর পেয়ারার ভাসমান বাজার, অন্যদিকে রয়েছে উপমহাদেশের কিংবদন্তি নেতা শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের জন্মভিটা চাখার। ভ্রমণপিপাসু কিংবা ইতিহাস অনুরাগী কারও জন্যই এ অভিজ্ঞতা বিস্মৃত হওয়ার মতো নয়।
ঝালকাঠির ভিমরুলী গ্রামে অবস্থিত এই ভাসমান বাজার মূলত দেশের অন্যতম প্রধান পেয়ারার আবাদকেন্দ্র। বর্ষাকাল এলে চারপাশে নদী ও খালের বুকে নৌকা ভেসে ওঠে; প্রতিটি নৌকায় ভরা থাকে সবুজ, সোনালি আর হালকা হলুদ রঙের পেয়ারায়। শত শত নৌকার সমাবেশ যেন প্রকৃতির বুকে রঙিন উৎসব।
প্রতিদিন ভোর থেকে নৌকায় জমে ওঠে বাজার। কৃষকরা নিজেদের বাগান থেকে তোলা পাকা পেয়ারা, আমড়া, ও কাঠাল নিয়ে আসে। ক্রেতা, পাইকার আর ভ্রমণকারীর ভিড়ে জমজমাট হয়ে ওঠে চারপাশ। নদীর মাঝখানে বসে বেচাকেনার এই অনন্য ধারা আজ বিশ্বব্যাপী পরিচিত।
বর্ষার দিনে যখন আকাশ মেঘলা, নদীর ঢেউ দোল খায়, তখন সেই ভাসমান বাজারের দৃশ্য যেন জীবন্ত ক্যানভাস। পেয়ারার সবুজ রঙ, নৌকার কোলাহল আর প্রকৃতির শান্ত মায়া মিলে এটি হয়ে ওঠে অপরূপ অভিজ্ঞতা।
ভিমরুলী থেকে দুপুরের খাবার শেষ করে যাত্রা শুরু করলে কিছু দূরেই দেখা মেলে চাখার গ্রামের। ঝালকাঠি সরকারি কলেজের সামনের রাস্তা ধরে এগোতে হয়। এক পাশে নদী, অন্য পাশে গ্রামীণ প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য। এ পথ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক পবিত্র ঠিকানায়—শেরে বাংলার বাড়ি।
চাখারের পুরনো সেই বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে, তবে অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। ভগ্নপ্রায় দেওয়াল, নিস্তব্ধ উঠান আর জীর্ণ কাঠামো যেন সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে। পাশে রয়েছে তাঁর পরিবারের কবরস্থান এবং একটি পুরনো মসজিদ, যা সংস্কারের নামে হারিয়েছে আসল রূপ।তিনি ছিলেন একইসঙ্গে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা।কলকাতা সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র ছিলেন তিনি।বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কৃষক-শ্রমিকের পক্ষে ছিলেন অকৃত্রিম কণ্ঠস্বর।ইতিহাসখ্যাত ‘লাহোর প্রস্তাব’ (পাকিস্তান রেজোলিউশন)-এর অন্যতম প্রস্তাবকও তিনি।
চাখারের উঠোনে দাঁড়ালে চোখে ভেসে ওঠে ইতিহাসের সেই দিনগুলো, যখন এক গ্রামীণ তরুণের কণ্ঠস্বর পৌঁছে গিয়েছিল উপমহাদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে।
দেশ-বিদেশের অসংখ্য দর্শনার্থী প্রতিদিন আসেন এই বাড়ি দেখতে। কিন্তু ভগ্নদশা দেখে অনেকেই হতাশ হন। স্থানীয়রা বারবার সংরক্ষণের দাবি জানালেও এখনো যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
শেরে বাংলার জন্মভিটা শুধু একটি বাড়ি নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। অথচ সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি যেন হারিয়ে যাচ্ছে কালের গহ্বরে।শ্রেষ্ঠ সময়: বর্ষাকাল (জুলাই–সেপ্টেম্বর) ভিমরুলীর সৌন্দর্য উপভোগের জন্য সেরা সময়।যাতায়াত: ঝালকাঠি শহর থেকে সড়কপথে সহজেই পৌঁছানো যায় ভিমরুলী ও চাখারে।কি দেখা যাবে: পেয়ারার ভাসমান বাজার, শেরে বাংলার বাড়ি, পুরনো মসজিদ, কবরস্থান ও গ্রামীণ সৌন্দর্য।
ঝালকাঠি ও ভিমরুলীর আশেপাশে রয়েছে স্থানীয় খাবারের দোকান। তাজা মাছ, গ্রামীণ পোলাও বা স্থানীয় শুটকি দিয়ে অতিথিদের অভ্যর্থনা করেন স্থানীয়রা।
চাখার ও ভিমরুলী ভ্রমণ কেবল প্রকৃতি দেখা নয়, বরং ইতিহাস ছোঁয়ার অনুভূতি। ভাসমান বাজার আমাদের কৃষির প্রাণশক্তি দেখায়, আর শেরে বাংলার জন্মভিটা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—কীভাবে একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেও বিশ্বমানের নেতা উঠে আসতে পারেন।
আমরা বিশ্বাস করি, চাখারের বাড়িকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। কারণ শেরে বাংলার ইতিহাস মানে শুধু এক নেতার কাহিনি নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। ভিমরুলীর ভাসমান বাজারও কৃষি-সংস্কৃতির এক জীবন্ত নিদর্শন, যা পর্যটনের সম্ভাবনা বহন করছে।
ঝালকাঠির ভিমরুলীর পেয়ারার ভাসমান বাজার ও চাখারের শেরে বাংলার জন্মভিটা একসঙ্গে প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অনন্য সমাহার। এ স্থান কেবল ভ্রমণপিপাসুদের জন্য নয়, বরং জাতির আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচারণা হলে এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটনের এক বড় আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১৭ আগস্ট ২০২৫


