প্রতিদিনের একঘেয়ে জীবন অনেক সময় শ্বাসরোধ করে তোলে। সকালবেলা অ্যালার্ম, অফিসের চাপ, যানজট, আর রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফেরা—এই চক্রে আটকে থাকতে থাকতে মনটা হঠাৎই বলে ওঠে, “আর না, একটু খোলা আকাশ চাই।” ঠিক সেই সময়েই প্রকৃতি হয়ে উঠতে পারে আপনার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। পাহাড়, বন, নদী বা সমুদ্র—এই সবই শহরের কোলাহল ভুলিয়ে দিতে পারে নিমেষে।
ভাল খবর হল, তার জন্য খুব বেশি পরিকল্পনা বা লম্বা ছুটি দরকার নেই। কলকাতা আর আশপাশেই রয়েছে এমন কিছু জায়গা, যেখানে দু’দিনের মধ্যেই ঘুরে এসে মনটাকে একদম হালকা করে নেওয়া যায়। শীতের মরসুমে এই জায়গাগুলির রূপ আরও মনকাড়া। চলুন জেনে নেওয়া যাক কাছেপিঠে ঘুরে আসার তিনটি শান্ত, নিরিবিলি ভ্রমণ ঠিকানা।
গুড়গুড়িপাল: শাল-সেগুনে মোড়া সবুজ অরণ্যের ডাক
শহরের কংক্রিট ছেড়ে যদি সত্যিকারের সবুজের মধ্যে হারিয়ে যেতে চান, তা হলে গুড়গুড়িপাল একেবারে আদর্শ জায়গা। পশ্চিম মেদিনীপুরের এই অরণ্য মূলত শালগাছে ভরা। তার ফাঁকে ফাঁকে চোখে পড়ে সেগুন আর আকাশমণির মতো গাছ। সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন একটা জীবন্ত সবুজ ক্যানভাস।
অরণ্যের খানিক দূর দিয়েই বয়ে গিয়েছে কাঁসাই নদী। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকলে মনে হবে, সময়টা থমকে গেছে। এখানে রয়েছে একটি ইকো পার্কও। তবে গুড়গুড়িপালে যাওয়ার আসল কারণ পার্ক দেখা নয়। এখানে মানুষ আসে নিজের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে, নিঝুম দুপুরে গাছের ছায়ায় বসে থাকতে, কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে নদীর ধারে বসে নিঃশব্দে গল্প করতে।
পাখিপ্রেমীদের জন্য এই জায়গা সত্যিকারের স্বর্গ। নানান রকমের পাখির আনাগোনা লেগেই থাকে। ক্যামেরা থাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাবে টেরও পাবেন না। চাইলে জঙ্গলঘেরা ছোট ছোট গ্রামেও ঢুঁ মারতে পারেন। সেখানকার সরল জীবন ছুঁয়ে দেখার অভিজ্ঞতা আলাদা।
কীভাবে যাবেন:
হাওড়া থেকে ট্রেনে মেদিনীপুর পৌঁছন। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে গুড়গুড়িপাল চলে যেতে পারবেন। চাইলে কলকাতা থেকে সরাসরি গাড়িতেও যেতে পারেন। সময় লাগবে প্রায় চার ঘণ্টা।
কোথায় থাকবেন:
গুড়গুড়িপালে বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি একটি নেচার ক্যাম্প রয়েছে। জঙ্গলের মধ্যে তাঁবুতে থাকার ব্যবস্থা। প্রকৃতির একদম কাছাকাছি থাকতে চাইলে এই অভিজ্ঞতা দারুণ। বেশি অপশন চাইলে মেদিনীপুর শহরে ফিরে থাকা যায়।
কানাইচট্টা: ভিড়হীন সমুদ্র, নিরালা শান্তির ঠিকানা
দিঘা মানেই ভিড়, হইচই আর দোকানের সারি—এই ধারণা যদি বদলাতে চান, তা হলে কানাইচট্টা সৈকত আপনার জন্য। দিঘার কাছেই, কাঁথির অদূরে দরিয়াপুর গ্রামে এই সমুদ্রসৈকত এখনও অনেকটাই অচেনা। তাই এখানে নেই অতিরিক্ত পর্যটকের ভিড়। আছে শুধু সমুদ্র, খোলা আকাশ আর নিস্তব্ধতা।
কানাইচট্টায় গেলে মনে হবে, সমুদ্রটা যেন শুধুই আপনার। বিকেলের দিকে ট্রলারের আনাগোনা দেখা যায়। পড়ন্ত রোদে প্রিয় মানুষের সঙ্গে বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকলে সময়ের হিসেব গুলিয়ে যায়। শহরের ব্যস্ততা তখন বহু দূরের গল্প।
থাকার জন্য এখানে রয়েছে একটি বিচ ক্যাম্প। গাছপালা ঘেরা খোলা পরিবেশে বড় তাঁবুতে থাকার ব্যবস্থা। খাট-বিছানা সবই থাকে। বিলাসিতা নেই, কিন্তু আরাম আর স্বস্তির কোনও অভাব নেই। বাড়তি পাওনা হল টাটকা মাছ, কাঁকড়া আর চিংড়ি। সন্ধ্যায় খোলা আকাশের নীচে বসে খাবার খাওয়ার মজাই আলাদা।
এখান থেকে চাইলে আশপাশের জায়গাও ঘুরে নিতে পারেন। দরিয়াপুর বাতিঘর, পেটুয়াঘাট কিংবা হিজলি শরিফ—সবই কাছাকাছি।
কীভাবে যাবেন:
ট্রেনে এলে কাঁথি স্টেশনে নেমে অটো ভাড়া করে কানাইচট্টা পৌঁছন। বাসে এলে কলকাতা থেকে দিঘাগামী বাস ধরে কাঁথির রূপশ্রী বাইপাসে নামতে হবে। সেখান থেকে অটো বা ট্রেকার ধরে দরিয়াপুর হয়ে সৈকতে যাওয়া যায়। গাড়িতেও সরাসরি পৌঁছনো সম্ভব।
কোথায় থাকবেন:
সৈকতের কাছেই বেসরকারি বিচ ক্যাম্প রয়েছে। চাইলে লাইট হাউসের পাশের রিসর্টেও থাকতে পারেন।
বড়দি পাহাড়: টিলা, বন আর নদীর অপূর্ব মেলবন্ধন
পাহাড় বলতে অনেকে যা ভাবেন, বড়দি পাহাড় ঠিক তেমন নয়। পাহাড়ের চেয়ে টিলা বলাই ভাল। কিন্তু সৌন্দর্যে কোনও অংশে কম নয়। বাঁকুড়া জেলার এই জায়গাটির চারপাশ জুড়ে শাল আর মহুয়ার বন। খানিক দূর দিয়ে বয়ে চলেছে কংসাবতী নদী।
অরণ্য পথে হাঁটলে পায়ের কাছে লতাপাতা জড়িয়ে ধরে। পাখির ডাক আর পাতার মর্মর মিলিয়ে একটা অন্য রকম শান্ত পরিবেশ তৈরি হয়। বাঁকুড়ায় গরমের সময় ঘোরা বেশ কষ্টকর। কিন্তু শীতের মরসুমে রোদ মেখে বড়দি পাহাড় ঘোরা সত্যিই আরামদায়ক।
পাহাড়ে ওঠার সময়ই চোখে পড়বে কংসাবতী নদী। উপরে উঠলে দৃশ্যটা আরও বদলে যায়। চারপাশে শুধু সবুজ আর নীল আকাশ। এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে মনে হবে, শহরের সব ক্লান্তি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
এখান থেকে চাইলে মুকুটমণিপুরও ঘুরে নিতে পারেন। কেউ বড়দিতে ঘুরে মুকুটমণিপুরে রাত্রিবাস করেন, কেউ আবার উল্টোটা।
কীভাবে যাবেন:
কলকাতা থেকে বড়দি পাহাড়ের দূরত্ব প্রায় ২১০ কিলোমিটার। হাওড়া থেকে ট্রেনে বাঁকুড়া পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে বড়দি পাহাড়ে যেতে পারেন। সড়কপথেও যাওয়া যায়।
শেষ কথা
মন ভালো রাখতে কখনও কখনও শুধু একটু প্রকৃতি দরকার। বড় হোটেল, কড়া পরিকল্পনা বা বিদেশ সফর নয়—কাছেপিঠের এই জায়গাগুলিই দু’দিনে আপনাকে নতুন করে চাঙ্গা করে দিতে পারে। শীতের এই সময়টা কাজে লাগান। ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। শহর তো থাকছেই, প্রকৃতি কিন্তু ডাকছে।


