ইছামতি নদীর দক্ষিণ তীরে দাঁড়িয়ে আছে যশোর জেলার শার্শা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গ্রাম গোগা। একসময় এই গ্রামে যেতে হতো আঁকাবাঁকা কাঁচা পথ পেরিয়ে। কালের বিবর্তনে আজ সেখানে এসেছে পাকা রাস্তা, ডিস লাইন এবং শহরের আধুনিক সুবিধা। ছোট্ট এই গ্রামীণ বাজারে এখন পাওয়া যায় শহরের প্রায় সবকিছু। তবে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও গোগা তার প্রাচীন গ্রামীণ রূপ ও ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছে।
২০১২ সালের মার্চ মাসে এক বিকেলে গ্রামের পথে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। সূর্য যখন ইছামতির পশ্চিমে ডুবছিল, ওপারের ভারতের পিপলী গ্রামের মানুষ গরু-ছাগল নিয়ে মাঠ থেকে ফিরছিল। মাথায় ছিল সবুজ ঘাসের বোঝা। এপারের দৃশ্যও ছিল হুবহু একই—দিনভর পরিশ্রম শেষে কৃষকেরা ফিরছিল নিজেদের ঘরে। সন্ধ্যার সেই দৃশ্য আজও গোগাকে জীবন্ত করে তোলে।
ঐতিহাসিক দলিলপত্র ঘেঁটে জানা যায়, একসময় গোগা ছিল শতভাগ হিন্দু অধ্যুষিত একটি গ্রাম। ১৮৫১ সালের ২৬ এপ্রিল ইংরেজ নীলকরের ম্যানেজার টমাস ম্যাচেল এই গ্রামে আসেন। তার দিনলিপিতে তিনি গোগার অন্নপূর্ণা উৎসবের একটি প্রাণবন্ত বর্ণনা দেন।
তিনি লিখেছিলেন,
“রুদ্রপুর ফ্যাক্টরির দু’ মাইল উত্তরে গোগা নামে একটি গ্রাম। সেখানে আজ অন্নপূর্ণা উৎসব উপলক্ষে বসেছে জমজমাট মেলা। সকালবেলায় দোকানিরা ছোট চালায় বসেছে—কেউ মিষ্টির থালা থেকে মাছি তাড়াচ্ছে, কেউবা হুঁকো টানছে। কয়েকজন শিশু লাট্টু খেলছে, আবার নদীতে ব্রাহ্মণরা স্নান শেষে পূজায় মগ্ন। ঠিক তখন পাশের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো এক শোভাযাত্রা। তার পেছনে দু’টি ঘোড়ায় চড়ে এলেন এক ব্রাহ্মণ ও আমার মুহুরি, তাদের সঙ্গে হেঁটে আসছিল গ্রামের মানুষ।”
এই বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, দেড়শ বছর আগেও গোগা ছিল সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। ধর্মীয় উৎসব, মেলা, শোভাযাত্রা এবং লোকজ বিনোদনের মাধ্যমে গ্রামটি ছিল এক জীবন্ত সম্প্রদায়।
আজকের গোগা আর সেই দিনের গোগা এক নয়। আধুনিকতার স্পর্শে কিছুটা পরিবর্তন এলেও নদীর ধারে সন্ধ্যায় গরু-ছাগল নিয়ে ঘরে ফেরা মানুষ কিংবা মেলার স্মৃতি—সব মিলিয়ে গ্রামটি এখনও বহন করছে দীর্ঘ ইতিহাস ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
গ্রামীণ জীবনযাত্রা, ধর্মীয় উৎসব এবং সামাজিক বন্ধনের কারণে গোগা আজও পরিচিত ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে। এখানকার মেলা ও পূজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং গ্রামীণ সংস্কৃতির মিলনমেলা।
শহরের সুবিধা পৌঁছালেও গোগার প্রাণ রয়ে গেছে তার কৃষিকাজ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আন্তরিক সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেই। ইছামতির তীর, কৃষকের পরিশ্রম, গবাদি পশুর যত্ন আর সন্ধ্যার মিছিল—সব মিলিয়ে গোগা এক জীবন্ত ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি।
যশোরের শার্শার গোগা গ্রাম শুধু একটি বসতি নয়, বরং এটি এক ঐতিহ্যের ভান্ডার। দেড়শ বছর আগের টমাস ম্যাচেলের লেখা থেকে শুরু করে আজকের বাস্তবতা—সব মিলিয়ে গোগা এখনও বহন করে চলেছে সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানবিক মূল্যবোধের অনন্য ধারাবাহিকতা।
✍️ তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ২০ আগস্ট ২০২৫


