যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলা—প্রকৃতি যেন এখানে নিজের হাতে রঙতুলি দিয়ে এঁকে রেখেছে নিখুঁত এক চিত্রকর্ম। এই জনপদের নিসর্গজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য বাওড় ও জলাশয়, যেগুলোতে প্রতিফলিত হয় সময়ের নান্দনিকতা ও প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য। তারই মধ্যে এক অপূর্ব জলভূমি হচ্ছে খড়িঞ্চা বা মাধবপুর বাওড়। বিকেলের রঙে যখন আলো-ছায়া খেলতে থাকে এই জলে, তখন মনে হয়—এ যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক জীবন্ত জলছবি।
বাওড়ের পরিচয় ও অবস্থান
যশোরের চৌগাছা উপজেলার স্বরুপদাহ ইউনিয়নে অবস্থিত খড়িঞ্চা বা মাধবপুর বাওড়ের আয়তন প্রায় ২৮১ একর। এটি একটি প্রকৃতিগতভাবে তৈরি চিংড়ি-আকৃতির বাওড় হলেও বর্তমানে একে অনেকটাই গোলাকার ও বিস্তৃত মনে হয়। চৌগাছা শহর থেকে পুড়াপাড়া রোড বা স্বরুপদাহ গ্রাম ধরে সহজেই পৌঁছানো যায় এই জলাধারে। যারা প্রকৃতির সাথে আত্মিক সম্পর্ক খুঁজে ফেরেন, তাঁদের জন্য এই বাওড় এক অনন্য গন্তব্য।
সূর্যাস্তের মোহনীয় দৃশ্য: বিকেলের জাদু
যাদের চোখে বিকেলের আলোতেই প্রকৃতি সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগে, তাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে এই বাওড়। সূর্য যখন পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ে, তখন তার লালচে আলো পানির উপর ছড়িয়ে দেয় এক অতুলনীয় সৌন্দর্য। চারদিকে তখন নেমে আসে এক স্বর্গীয় নিস্তব্ধতা—শুধু শোনা যায় বাতাসে সাঁই সাঁই শব্দ আর দূর থেকে ভেসে আসা পাখির ডানার ঝাপট। এই দৃশ্য একবার দেখলে, চিরকাল মনে গেঁথে থাকে।
শীতের সকাল ও জলপথের সৌন্দর্য
শীতকালে এই বাওড় যেন আরও বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে। কুয়াশায় মোড়া সকালের জলরাশিতে সূর্যের আলো পড়লে সৃষ্টি হয় এক রূপকথার পরিবেশ। তখন নৌকায় চড়লে মনে হয়, যেন সময়ও ধীরে ধীরে থেমে গেছে। মাছ চাষিদের কাছ থেকে নৌকা নিয়ে সহজেই ঘুরে দেখা যায় পুরো বাওড়ের সৌন্দর্য।
মাছ চাষ ও জলজ জীববৈচিত্র্য
এই বাওড় শুধু দর্শনীয় স্থানই নয়, এটি একটি উৎপাদনশীল মাছ চাষের কেন্দ্র। এখানকার বহু মানুষ মাছ চাষের সাথে যুক্ত এবং তাদের জীবিকা এই বাওড়কে ঘিরেই গড়ে উঠেছে। এখানে রয়েছে নানা প্রজাতির মাছ, যেমন রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প ইত্যাদি। স্থানীয়রা প্রতিদিন বাওড়ের বুক চিরে নৌকা চালিয়ে চলে যান নিজেদের মাছের ঘেরে।
বেলন বিলের হারানো গৌরব
একসময় এই বাওড়ের পাশে ছিল বেলন বিল নামক এক পদ্মফুলে ভরা জলাভূমি। বর্ষার দিনে সাদা, গোলাপি আর লাল পদ্মে ঢাকা থাকতো গোটা বিল। সেই সময়ের দৃশ্য সত্যি বলতে অপার্থিব ছিল। কিন্তু বাণিজ্যিক মাছ চাষের চাপে কেটে ফেলা হয়েছে পদ্মগাছ, বিলটি আজ শুধুই স্মৃতির পাতায়। হারানো এই সৌন্দর্য প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে কষ্টের এক গভীর ছাপ ফেলে।
দেবালয় গ্রামের ইতিহাস ও নামকরণ
বাওড়ের পশ্চিম দিকে রয়েছে দেবালয় নামের একটি ঐতিহাসিক গ্রাম। এই গ্রামের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে চাঁচড়া জমিদার ভবেশ্বর সিংহ মজুমদারের পরিবারের সঙ্গে। জমিদারের ছোট ছেলে বিনোদ রায় সিংহ ও তার বংশধররা এই অঞ্চলে বসতি গড়েন এবং গড়ে তোলেন একটি মন্দির, যা থেকেই ‘দেবালয়’ নামটি উদ্ভূত।
আজও সেই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দাঁড়িয়ে আছে, যেন কালের সাক্ষী হয়ে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় জমিদারি আমলের দিনগুলো, পারিবারিক কাহিনী এবং স্থানীয় স্থায়ী বসতির সূচনা।
যা দেখবেন এবং যা জানবেন
খড়িঞ্চা বা মাধবপুর বাওড়ে ভ্রমণের সময় আপনি যেসব বিষয় দেখতে ও জানতে পারবেন:
- সূর্যাস্তের অসাধারণ দৃশ্য, যা প্রতিদিন নতুনরূপে ধরা দেয়
- নৌকাভ্রমণের অভিজ্ঞতা, যা আপনাকে প্রকৃতির গভীরে নিয়ে যাবে
- বেলন বিলের ইতিহাস, যেটি আজ শুধু স্মৃতিতে রয়ে গেছে
- দেবালয় গ্রামের প্রাচীন মন্দির, ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণীয়
কেন যাবেন এই বাওড়ে?
এই বাওড় একাধারে ভ্রমণপ্রেমী, ইতিহাসবিদ, প্রকৃতিপ্রেমী ও ফটোগ্রাফারদের জন্য স্বর্গস্বরূপ। যাঁরা প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ খুঁজে ফেরেন, তাঁদের কাছে এই স্থান শুধুই একটি ভ্রমণস্থল নয়—এটি এক মানসিক পরিপূর্ণতা।
যদি কেউ প্রকৃতিকে অনুভব করতে চান হৃদয়ের গভীরে, তবে এক বিকেল কাটাতে হবে খড়িঞ্চা বা মাধবপুর বাওড়ে। এখানে সূর্যাস্তের সাথে সাথে মনের ক্লান্তি মুছে যাবে, তৈরি হবে শান্তির অনুভব।
যেভাবে যাবেন
- চৌগাছা শহর থেকে মাত্র ৭-৮ কিলোমিটার দূরত্ব
- যশোর জেলা সদর থেকে মোটরবাইক, সিএনজি বা বাসে করে পৌঁছানো যায়
- স্বরুপদাহ ইউনিয়নের যে কোনো দিক দিয়ে পৌঁছনো সম্ভব: পুড়াপাড়া রোড বা দেবিদাসপুর গ্রাম হয়ে
- স্থানীয় মানুষদের কাছ থেকে নৌকা ভাড়া নিয়ে পুরো বাওড় ঘোরা যায়
ভ্রমণ টিপস
- বিকেল ৩টার পর বাওড়ে পৌঁছানো সবচেয়ে ভালো, সূর্যাস্ত উপভোগ করতে পারবেন
- ফটোগ্রাফি করতে চাইলে ডিএসএলআর বা স্মার্টফোন ক্যামেরা প্রস্তুত রাখুন
- স্থানীয়দের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করুন, মাছ চাষের এলাকা বলে কিছু বিধি মানা জরুরি
- বর্ষাকালে নৌকাভ্রমণ একটু ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, সতর্ক থাকুন
শেষ কথায়
খড়িঞ্চা বা মাধবপুর বাওড় শুধুমাত্র একটি জলাশয় নয়—এটি যশোরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনের মেলবন্ধন। এখানে সময়ের ধারা থেমে যায়, প্রকৃতির ক্যানভাসে আঁকা হয় এক অনন্য সৌন্দর্য। আপনি যদি প্রকৃতি, ইতিহাস ও শান্ত পরিবেশের খোঁজে থাকেন, তবে আপনার পরবর্তী গন্তব্য হোক এই বাওড়।
আপনি এই জায়গা থেকে ফিরে আসবেন বটে, কিন্তু মনটা রয়ে যাবে সূর্য ডোবা সেই নীল জলের গভীরে।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ৬ আগস্ট ২০২৫


