নবাবি ঐতিহ্য, সুস্বাদু খাবার আর মার্জিত সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত লখনউ। সেই নবাবের শহরেই এবার নতুন চমক। বহু বছর পর শহরের রাস্তায় আবার দেখা মিলল দোতলা বাসের। নতুন বছরের শুরুতেই লখনউবাসী ও পর্যটকদের জন্য যেন এক বিশেষ উপহার। গত ৭ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে এই দোতলা বাস পরিষেবা, যা মূলত পর্যটনকে কেন্দ্র করেই পথে নেমেছে।
লখনউতে ফিরল দোতলা বাসের ঐতিহ্য
একটা সময় ছিল, যখন কলকাতা সহ ভারতের একাধিক শহরে দোতলা বাস ছিল খুবই পরিচিত দৃশ্য। ধীরে ধীরে সেই বাস হারিয়ে গিয়েছিল সময়ের স্রোতে। কিন্তু এবার আবার সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে লখনউ। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পুরনো দিনের নস্টালজিয়ার মেলবন্ধন ঘটিয়ে শহরের রাস্তায় নামানো হয়েছে এই নতুন দোতলা বাস।
এই বাস শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং শহর দেখার এক অভিনব অভিজ্ঞতা। ওপরে বসে শহরের রাস্তা, স্থাপত্য আর ব্যস্ত জীবন দেখার আলাদা মজা পাচ্ছেন যাত্রীরা।
বিদ্যুৎচালিত দোতলা বাস, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ
এই দোতলা বাস পুরোপুরি বিদ্যুৎচালিত। ফলে দূষণ কমানোর দিক থেকেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আধুনিক শহরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবেশবান্ধব পরিবহণ ব্যবস্থার দিকেই হাঁটছে লখনউ। শব্দ কম, ধোঁয়া নেই, আর যাত্রাও আরামদায়ক—সব মিলিয়ে এই বাস শহরের পরিবহণ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
শুধুই পর্যটকদের জন্য বিশেষ পরিষেবা
এই দোতলা বাস সাধারণ যাতায়াতের জন্য নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে পর্যটন কেন্দ্রিক। বাসে যাঁরা উঠছেন, তাঁরা সবাই পর্যটক। সকালে ও বিকেলে নির্দিষ্ট সময় ধরে এই বাস শহরের বিভিন্ন রাস্তায় ঘুরছে। লক্ষ্য একটাই—লখনউ শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় স্থানগুলো একসঙ্গে দেখানো।
পর্যটকদের জন্য এটি বেশ সুবিধাজনক। আলাদা করে গাড়ি ভাড়া বা পথ খোঁজার ঝামেলা নেই। এক বাসেই ঘোরা যাচ্ছে শহরের একাধিক দ্রষ্টব্য স্থান।
কোন কোন জায়গা ঘোরাচ্ছে এই দোতলা বাস?
এই দোতলা বাসে চেপে পর্যটকরা ঘুরে দেখছেন লখনউয়ের আধুনিক ও পরিচিত এলাকার নানা জায়গা। গোমতী নদীর ধারের সুন্দর পরিবেশ থেকে শুরু করে লখনউয়ের বিধানসভা ভবন—সবই রয়েছে এই রুটে।
হজরতগঞ্জের ব্যস্ত এলাকা, বেগম হজরত মহল পার্কের সবুজ পরিবেশ—এমন আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঘোরানো হচ্ছে এই বাসে। ওপেন-টপ অনুভূতির জন্য উপরের তলা থেকে শহরের দৃশ্য দেখতে পর্যটকরা বিশেষভাবে উপভোগ করছেন।
পুরনো লখনউ নেই তালিকায়
তবে একটি বিষয় অনেকের চোখে পড়েছে। এই দোতলা বাস পুরনো লখনউ অঞ্চলে যাচ্ছে না। ফলে বড়া ইমামবাড়া, রুমি গেট, চৌক—এই বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থানগুলো আপাতত এই ট্যুরের অন্তর্ভুক্ত নয়।
অনেক পর্যটকই আশা করছেন, ভবিষ্যতে যদি রুট বাড়ানো হয়, তাহলে পুরনো লখনউকেও এই পরিষেবার আওতায় আনা হবে। কারণ লখনউ মানেই শুধু আধুনিক শহর নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু শতাব্দীর ইতিহাস।
প্রথম দিন থেকেই নজর কাড়ল দোতলা বাস
পরিষেবা চালু হওয়ার পর থেকেই দোতলা বাস ঘিরে উৎসাহ চোখে পড়ার মতো। পর্যটকদের পাশাপাশি লখনউ শহরের বাসিন্দারাও এই বাসে চেপে নিজেদের শহরটাকে নতুন করে দেখছেন। অনেকেই বলছেন, প্রতিদিন যে রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেন, ওপরে বসে সেই রাস্তাকেই অন্য চোখে দেখা যাচ্ছে।
ছবি তোলা, ভিডিও করা—সব মিলিয়ে এই দোতলা বাস এখন লখনউ ঘোরার এক নতুন স্টাইল হয়ে উঠেছে।
উত্তরপ্রদেশ রাজ্য পরিবহণের উদ্যোগ
এই দোতলা বাস পরিষেবার উদ্যোগ নিয়েছে উত্তরপ্রদেশ রাজ্য পরিবহণ নিগম। মূল উদ্দেশ্য, লখনউ শহরে আসা পর্যটকদের জন্য সহজ, নিরাপদ এবং আকর্ষণীয় শহর দর্শনের ব্যবস্থা করা।
পর্যটন বাড়ালে শহরের অর্থনীতিও চাঙ্গা হয়। হোটেল, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়ে। সেই দিক মাথায় রেখেই এই বিশেষ পরিষেবা চালু করা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পর্যটনের সঙ্গে শহরের নতুন পরিচয়
এই দোতলা বাস শুধু পর্যটকদের সুবিধাই দিচ্ছে না, বরং লখনউ শহরের একটি আধুনিক পরিচয়ও তুলে ধরছে। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনই লখনউয়ের আসল শক্তি। সেই শক্তিকেই নতুনভাবে তুলে ধরছে এই বাস পরিষেবা।
যাঁরা প্রথমবার লখনউ আসছেন, তাঁদের কাছে এটি শহর চেনার এক সহজ উপায়। আবার যাঁরা এখানকার বাসিন্দা, তাঁদের কাছে এটি নস্টালজিয়া আর নতুন অভিজ্ঞতার মিশেল।
ভবিষ্যতে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
অনেকেরই মত, যদি এই পরিষেবা জনপ্রিয় হয়, তাহলে ভবিষ্যতে রুট বাড়ানো হতে পারে। পুরনো লখনউ, ঐতিহাসিক স্থাপত্য, নবাবি নিদর্শন—সবকিছুই এই দোতলা বাসের মাধ্যমে দেখানো সম্ভব। তাতে লখনউ পর্যটন আরও সমৃদ্ধ হবে।
এছাড়া সময়সূচি বাড়ানো বা আরও বাস নামানোর কথাও ভাবা হতে পারে। পর্যটকদের চাহিদার উপরেই নির্ভর করবে পরবর্তী সিদ্ধান্ত।


