সমীর রায় চৌধুরীর ফিরে দেখা অতীতের ছায়ায়
গত বছর যশোরের গঙ্গানন্দপুর গ্রামে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন কলকাতার বিশিষ্ট লেখক ও কবি সমীর রায় চৌধুরী। তাঁর আগমন কেবল ভ্রমণ নয়, ছিল এক আত্মিক সফর, যেখানে তিনি খুঁজে ফিরছিলেন তাঁর শ্রদ্ধেয় আত্মীয় মহীতোষ রায় চৌধুরী-র শিকড়। যিনি একসময় এই মাটিতে স্বপ্ন বুনেছিলেন, সমাজের পরিবর্তনের দীপ্ত শিখা জ্বালিয়েছিলেন, এবং শিক্ষা ও মানবসেবায় রেখে গেছেন অমোঘ ছাপ।
গঙ্গানন্দপুর: ইতিহাস ও আলোর পথচলা
গঙ্গানন্দপুর নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক সময়ের শিক্ষার দীপ্ত প্রতীক। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার এই শান্ত গ্রামটি একসময় ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক আলোয় উদ্ভাসিত এক মাটি। এখানেই ছিল মহীতোষ রায় চৌধুরীর পৈত্রিক নিবাস, এবং এখান থেকেই তাঁর জীবনযাত্রার সূচনা। সমীর রায় চৌধুরী যখন এই মাটিতে পা রাখেন, তখন চারপাশ নিস্তব্ধ। হাওয়ার দোলায় ভেসে আসছিল যেন অতীতের কোনো ডাক—“এই তো সেই মাটি, যেখানে স্বপ্ন জন্ম নিয়েছিল।”
মহীতোষ রায় চৌধুরী: শিক্ষায়, সমাজে ও রাজনীতিতে এক দীপ্ত নাম
মহীতোষ রায় চৌধুরী ছিলেন সেই মানুষ, যিনি কেবল একজন শিক্ষানুরাগী ছিলেন না, ছিলেন একাধারে শিক্ষক, সাংবাদিক, সমাজসংস্কারক ও রাজনৈতিক নেতাও। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করে বঙ্গবাসী কলেজে দর্শন বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁর কলম ছিল তীক্ষ্ণ, বুদ্ধিদীপ্ত—অমৃতবাজার পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক এবং হিন্দু স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার সহ-সম্পাদক হিসেবে তিনি রেখেছেন গভীর প্রভাব।
শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রপথিক
শিক্ষার বিস্তারে তিনি ছিলেন ‘অল বেঙ্গল প্রাইমারি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং দীর্ঘদিন ধরে ‘শিক্ষক’ পত্রিকার সম্পাদক। তাঁর হাত ধরেই পশ্চিমবঙ্গের প্রাথমিক শিক্ষা আন্দোলন পেয়েছিল একটি সুসংগঠিত রূপ। পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি শিক্ষানীতির পরিবর্তনে রেখেছেন অগ্রগণ্য ভূমিকা।
যশোর এম এম কলেজ: মহৎ স্বপ্নের বাস্তব রূপ
১৯৪০ সালে যশোর অঞ্চলে একটি মানসম্মত কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলে, মহীতোষ রায় চৌধুরী তাতে গ্রহণ করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কলকাতায় থেকে যশোরের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ, অর্থ সংগ্রহ, সরকারি অনুমোদন ও বিশ্ববিদ্যালয় স্বীকৃতি অর্জনের জন্য তাঁর যে নিরলস প্রচেষ্টা ছিল, তা সত্যিই অনন্য।
তিনি ছিলেন বিশ্বাসী একজন সংগঠক ও সমাজসেবক, যিনি শিকড়ের টানে আবারও জন্মভূমির দিকে ফিরেছিলেন, মানুষের জন্য কিছু করার বাসনায়। যশোর এম এম কলেজের পেছনে তাঁর অবদান আজও আলো হয়ে জ্বলছে।
সমীর রায়ের মাটিতে প্রণাম: শিকড় ছোঁয়ার মুহূর্ত
সমীর রায় চৌধুরী যখন পৌঁছান গঙ্গানন্দপুর গ্রামে, তখন চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পুরনো ভিটে, কিছু ভাঙা ইট, আর নিঃশব্দতার মাঝে তিনি মাথা নিচু করে প্রণাম করেন মাটিকে। তিনি বলেন, “এই ইটগুলো একসময় আমার আত্মীয়ের আশ্রয় ছিল—জ্ঞান, মমতা আর স্বপ্নের। আজ আমি ইতিহাসকে স্পর্শ করছি।”
এই দৃশ্য কেবল একটি আবেগময় মুহূর্ত ছিল না, ছিল সম্মান ও উত্তরাধিকার বোধের এক প্রতীক। তিনি হাত দিয়ে সেই ইটের টুকরো তুলছিলেন, যেন ইতিহাসকে অনুভব করছেন, সময়ের গহ্বরে ফিরে যাচ্ছেন।
গঙ্গানন্দপুর কলেজ: আলো ছড়ানো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
পরবর্তী গন্তব্য ছিল গঙ্গানন্দপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ। যদিও কলেজ সেদিন বন্ধ ছিল, তবুও আশেপাশের কয়েকজন বাসিন্দা এসে উপস্থিত হন। তাদের উদ্দেশে সমীর রায় চৌধুরী বলেন,
“আমার আত্মীয় কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন সমাজের জন্য উৎসর্গিত এক দীপ্ত আলো। এই স্কুল, এই মাটি সেই দীপ্তিরই সাক্ষী।”
গর্বিত গলায় তিনি জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষরা যা রেখে গেছেন, সবই জনকল্যাণে উৎসর্গ করেছেন। বাংলাদেশে তাঁদের পরিবারের জমিজমা সবই জনসেবায় দান করা হয়েছে।
গান্ধীবাদে বিশ্বাসী এক সমাজসেবী
সমীর রায় চৌধুরী আরও বলেন, “মহীতোষ রায় চৌধুরী ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে বিশ্বাসী। তিনি হরিজনদের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। এ নিয়ে আমরা গর্ব করি, এবং তাঁর আদর্শ আমাদের পথ দেখায়।”
এই সফর ছিল কেবল স্মৃতিচারণ নয়, ছিল আত্মার সঙ্গে শিকড়ের পুনর্মিলন। একজন লেখকের দৃষ্টিতে এ যেন ছিল একটি জীবন্ত ইতিহাসের খোঁজ।
যশোরের শিক্ষায় মহীতোষ রায়ের ভূমিকা
যশোরের শিক্ষা ব্যবস্থায় মহীতোষ রায়ের অবদান অনস্বীকার্য। শুধু কলেজ নয়, এলাকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও তিনি ছিলেন নেপথ্যের নেতৃত্বে। তাঁর প্রয়াসেই গড়ে উঠেছিল একটি আলোকিত সমাজ। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া সমাজের উন্নয়ন অসম্ভব। আর সেই চেতনাই তিনি কাজে পরিণত করেছিলেন।
সমীর রায়ের চোখে যশোর: ইতিহাসের এক পুনর্জন্ম
সমীর রায়ের এই সফর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতা নয়, বরং মানুষের স্মৃতি, অনুভব ও শ্রদ্ধায় বেঁচে থাকে। তিনি যেভাবে তাঁর আত্মীয়ের স্মৃতিকে ছুঁয়ে দেখেছেন, তাতে বোঝা যায়—এ শুধু ব্যক্তিগত ভ্রমণ নয়, এক সামাজিক উত্তরাধিকার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা।
যশোরের মাটি, গঙ্গানন্দপুরের বাতাস, কলেজের ছায়া—সব মিলিয়ে যেন তাঁর মনে হয়েছে, “আমি ফিরে এসেছি, ইতিহাসের কাছে, নিজের শিকড়ের কাছে।”
স্মৃতি, শিকড় ও ভবিষ্যতের মিলন
এই সফর কেবল স্মরণ নয়, এক গভীর উপলব্ধির উৎস। আমরা যদি আমাদের শিকড় ভুলে যাই, তাহলে ভবিষ্যতও আমাদের ভুলে যাবে। মহীতোষ রায় চৌধুরীর মতো মানুষরা ইতিহাস গড়েন। আর সমীর রায় চৌধুরীর মতো মানুষরা সেই ইতিহাসকে জাগিয়ে তোলেন, স্মৃতির আলোয় আলোকিত করেন প্রজন্মকে।
যশোরের গঙ্গানন্দপুর আজও গর্ব করতে পারে—তার বুকেই একদা জন্ম নিয়েছিলেন এমন একজন মানুষ, যার আদর্শ আজও বাতাসে ভেসে চলে।


