উত্তাল বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে পর্যটন স্বর্গে হাহাকার
সেন্টমার্টিন দ্বীপ, যা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যঘেরা পর্যটনকেন্দ্র, এখন ধ্বংসের মুখে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ এবং টানা বৃষ্টির ফলে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। এই ঢেউয়ের আঘাতে সেন্টমার্টিনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলবর্তী অন্তত ১১টি হোটেল-রিসোর্ট। উপড়ে পড়েছে গাছপালা, প্লাবিত হয়েছে লোকালয়, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন দ্বীপবাসী।
জলোচ্ছ্বাসে লণ্ডভণ্ড হোটেল ও রিসোর্ট: কোথায় কী ক্ষতি?
দ্বীপের সমুদ্রসংলগ্ন হোটেল ও রিসোর্টগুলো সরাসরি ঢেউয়ের মুখে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিচে উল্লেখযোগ্য হোটেল ও রিসোর্টগুলোর নাম:
- হোটেল অবকাশ
- নোনাজল বিচ রিসোর্ট
- আটলান্টিক রিসোর্ট
- বিচ ক্যাম্প রিসোর্ট
- নীল হাওয়া বিচ রিসোর্ট
- শান্তি নিকেতন বিচ রিসোর্ট
- মেরিন বিচ রিসোর্ট
- পাখি বাবা রিসোর্ট
- সি-ভিউ রিসোর্ট
- ড্রিমার্স প্যারাডাইস রিসোর্ট
- সানডে বিচ রিসোর্ট
স্থানীয়রা জানান, এই রিসোর্টগুলোর বেশিরভাগই জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতির পুরো চিত্র এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবে অবস্থানগত দিক থেকে এগুলোর অনেকটাই ধ্বংস হয়ে গেছে বলে প্রাথমিক ধারণা।
“এমন ভয়াবহতা আগে দেখিনি”— বলছেন স্থানীয়রা
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম জানান, জোয়ারের উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে ১-৩ ফুট বেশি ছিল, ফলে গাছপালা উপড়ে পড়েছে, শতাধিক ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়েছে লবণাক্ত পানি। এই দুর্যোগ দ্বীপের মানুষ আগে কখনও দেখেনি।
বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, “বিচের পাশে থাকা হোটেলগুলো পানির তোড়ে তলিয়ে গেছে। পানি নামার পর ধ্বংসাবশেষের ভয়াবহতা প্রকাশ পাচ্ছে।”
আরেকজন, আলী আহমদ বলেন, “সেন্টমার্টিনকে টিকিয়ে রাখতে চাই টেকসই বেড়িবাঁধ। এর কোনো বিকল্প নেই।”
পরিবেশবিদদের অভিযোগ: অনুমোদনহীন স্থাপনা এবং বালিয়াড়ি দখল
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক হোটেল-রিসোর্ট সরকারি অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করা কক্সবাজার ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক বলেন, “এই স্থাপনাগুলো মূলত অবৈধ। কিছু হোটেল বালিয়াড়ি দখল করে নির্মাণ হয়েছে, যা প্রকৃতির প্রতিশোধ ডেকে এনেছে।”
শাহপরীর দ্বীপে বিপর্যয়ের আশঙ্কা: বেড়িবাঁধের দুর্বলতা ফাঁস করে দিলো বাস্তবতা
সেন্টমার্টিনের পাশাপাশি টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ এখন নতুন সংকটে। ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ এলাকায় বসবাস করেন প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। চারপাশে সাগর ও নদী ঘেরা দ্বীপে বেড়িবাঁধ না থাকলে পুরো জনপদ বিলীন হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
২০২২ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ১৫১ কোটি টাকায় প্রায় ৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলেও, অল্প সময়েই বাঁধের সিসি ব্লক ভেঙে পড়ে।
“দুর্নীতিতে বাঁধ হয়নি”— দুই যুগের অভিযোগ স্থানীয়দের
শাহপরীর দ্বীপ রক্ষা কমিটির সভাপতি জাহেদ হোসেন বলেন, “১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ে ১ কিলোমিটার বাঁধ ধসে গিয়েছিল। এরপর ১০ বছরে ৩০০ কোটি টাকা খরচ হলেও সঠিকভাবে বাঁধ নির্মিত হয়নি। দুর্নীতি বাঁধার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।” তিনি আরো জানান, এর প্রভাবে ১০ হাজার একর চিংড়িঘের, ফসলি জমি, মসজিদ-মাদ্রাসাসহ প্রায় ৪ হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
দ্রুত ও দায়সারা নির্মাণেই আজকের পরিণতি
স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুল মান্নান জানান, “বাঁধের কাজের শুরুটা ভালো হলেও দক্ষিণপাড়ার জোয়ারপ্রবণ এলাকায় তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করায় কাঠামো দুর্বল হয়। এর ফলে বর্ষার পানিতে বাঁধের ব্লকগুলো ধসে পড়ে।”
জোয়ারে আতঙ্কিত ২০ হাজার মানুষ: নদীর জল লোকালয়ে
টেকনাফ উপজেলার জ্যৈষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন জানান, গত তিনদিন ধরে জোয়ারের পানি বেড়িবাঁধ টপকে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। এতে অন্তত ৪ হাজার পরিবারের ২০ হাজারের বেশি মানুষ চরম আতঙ্কে রয়েছেন। পরিস্থিতি এমন থাকলে পুরো বাঁধ বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পাউবো টেকনাফের উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, “বাঁধ টপকে পানি প্রবেশ করছে। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”


