শীতের শেষ বিকেল মানেই অন্য রকম এক অনুভূতি। রোদ তখন আর চোখে লাগে না, কুয়াশাও নেই। চারপাশে থাকে নরম আলো, লম্বা ছায়া আর এক ধরনের শান্ত বিষণ্নতা। এমনই এক শীত-শেষের বিকেলে যশোরের চৌগাছা উপজেলার তাহিরপুরে পৌঁছালে মনে হয়, সময় যেন একটু থমকে গেছে। এই জায়গা শুধু একটি গ্রাম নয়, এটি ইতিহাস, স্বপ্ন আর ব্যর্থতার নীরব দলিল।
তাহিরপুরে যাওয়ার পথ ও প্রকৃতির ছোঁয়া
তাহিরপুর–মদনপুর সড়ক ধরে এগোলে ভৈরব নদের ব্রিজের কাছাকাছি এসে চোখে পড়ে ভিন্ন এক দৃশ্য। পাকা রাস্তা ছেড়ে দক্ষিণে নামলেই শুরু হয় ইটের সোলিং পথ। এখানেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এক সময়ের শিল্পসভ্যতার ধ্বংসাবশেষ। ভাঙা ইট, অর্ধভাঙা দেয়াল আর নীরব পরিবেশ যেন নিজেরাই কথা বলতে চায়।
এরপর কাঁচা রাস্তা ধরে আরও দক্ষিণে গেলে ছোট একটি ব্রিজে ভৈরব নদ পার হতে হয়। নদীর জল তখন শান্ত, ধীর। মনে হয়, শত বছরের ইতিহাস তার বুকে লুকিয়ে রেখেছে। এই নদীই এক সময় শিল্প, বাণিজ্য আর মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল।
তাহিরপুরের চিনি কারখানা: এক বিস্মৃত শিল্প ইতিহাস
তাহিরপুরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় এর চিনি শিল্প। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই অঞ্চল ছিল শিল্পায়নের এক সম্ভাবনাময় কেন্দ্র। ১৮৬১ সালে নিউহাউস সাহেব চৌগাছার চিনিকলের একটি শাখা হিসেবে তাহিরপুরে চিনি কারখানা স্থাপন করেন। কপোতাক্ষ ও ভৈরব নদের মিলনস্থলকে বেছে নেওয়া হয়েছিল যোগাযোগ ও কাঁচামালের সুবিধার জন্য।
এই কারখানায় ইউরোপীয় প্রযুক্তিতে চিনি উৎপাদন হতো। শুধু তাই নয়, এখানে রাম মদ তৈরির ভাটিখানাও চালু ছিল। সেই সময়ের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও লাভজনক উদ্যোগ। কিন্তু ঋণ আর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় কিছুদিনের মধ্যেই সমস্যা দেখা দেয়।
মালিকানা পরিবর্তন ও ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা
১৮৮০ সালের পর কারখানাটি এমেট চেম্বার্স কোম্পানির হাতে যায়। নতুন মালিকরা কারখানা ও আবাসিক স্থাপনার উন্নয়ন করেন। চিনি পরিশোধনের জন্য হাড়ের গুঁড়া ব্যবহারসহ নতুন প্রযুক্তি চালুর চেষ্টা হয়। তবু পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। ১৮৮৪ সালে এই কোম্পানিও দেউলিয়া হয়ে পড়ে।
এরপর বালুচরের বাসিন্দা রায় বাহাদুর ধনপত সিংহ কারখানাটি কিনে নেন। তিনি ১৯০৬ সাল পর্যন্ত কারখানা চালু রাখেন। তাঁর প্রচেষ্টায় কিছুদিনের জন্য হলেও তাহিরপুর আবার প্রাণ ফিরে পায়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সেই উদ্যোগও টেকেনি।
শেষ চেষ্টা ও চূড়ান্ত পতন
১৯০৯ সালে আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখা হয়। মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজারের মহারাজ মণীন্দ্রচন্দ্র, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সারদা চরণ মিত্র, নড়াজোলের রাজা বাহাদুরসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি মিলিতভাবে “তারপুর চিনির কারবার” নামে একটি যৌথ উদ্যোগ শুরু করেন।
এই উদ্যোগে ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপান থেকে বিশেষজ্ঞ আনা হয়। এমনকি বিদেশে শিক্ষাপ্রাপ্ত একজন দেশীয় বিশেষজ্ঞও কারখানাটি বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। আধুনিক যন্ত্রপাতি, নতুন ব্যবস্থাপনা—সবই করা হয়েছিল। তবু সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাহিরপুরের চিনি কারখানা ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যায়।
পানিগ্রাম রিসোর্ট: আধুনিক স্বপ্নের ধ্বংসাবশেষ
তাহিরপুর শুধু ঔপনিবেশিক শিল্প ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে আধুনিক সময়ের এক ব্যর্থ স্বপ্নও দাঁড়িয়ে আছে। ভৈরব ও কপোতাক্ষ নদের মিলনস্থলে গড়ে ওঠার কথা ছিল “পানিগ্রাম রিসোর্ট”। পরিকল্পনা ছিল পাঁচ তারকা মানের হোটেল নির্মাণের, যেখানে প্রকৃতি আর বিলাস একসঙ্গে মিশে যাবে।
২০০৮ সালে আমেরিকান একটি সংস্থা এই প্রকল্পের জন্য বিনিয়োগ বোর্ড ও জয়েন্ট স্টক কোম্পানি থেকে নিবন্ধন নেয়। লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা। কিন্তু প্রকল্পটি শুরুতেই থেমে যায়। আজ সেই রিসোর্ট পরিত্যক্ত, আগাছায় ঢাকা, ভাঙা ভবন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ব্যর্থ আধুনিকতার প্রতীক হয়ে।
শীতের শেষ বিকেলে তাহিরপুরের অনুভব
এই সব ইতিহাস মাথায় নিয়ে যখন কাঁচা পথে হাঁটা যায়, তখন চারপাশের দৃশ্য অন্য রকম লাগে। ধুলো উড়িয়ে ধীরে ধীরে চলে কৃষকের গরুর গাড়ি। বিকেলের সূর্য তীর্যকভাবে শরীরে এসে লাগে। আলোটা উষ্ণ, আরামদায়ক। নদী, পথ আর ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে মিলে মুহূর্তগুলোকে গভীর করে তোলে।
তাহিরপুরে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এখানে সময় একাধিক স্তরে ভাগ হয়ে আছে। একদিকে ঔপনিবেশিক শিল্পের গল্প, অন্যদিকে আধুনিক পুঁজির ব্যর্থতা। দুটোই নীরবে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
তাহিরপুর কেন গুরুত্বপূর্ণ
তাহিরপুর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন আর স্বপ্ন সব সময় সফল হয় না। ইতিহাস শুধু বিজয়ের গল্প নয়, ব্যর্থতার কথাও বলে। এই ব্যর্থতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে শেখার সুযোগ। নদী বদলায়, সময় বদলায়, মানুষ বদলায়। কিন্তু কিছু গল্প মাটির গভীরে থেকে যায়।
লেখক: সাজেদ রহমান।


