সুন্দরবনের চেনা ছক ভাঙুন — এবার পা রাখুন কুমিরমারীর প্রান্তরে
সুন্দরবন— এই নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার আর ম্যানগ্রোভের ঘন জঙ্গল। কিন্তু এই বিপুল জৈববৈচিত্র্যের অরণ্য কি কেবল বাঘ আর কুমির দেখার জায়গা? নাকি এখানেই লুকিয়ে আছে বাংলার সহজ সরল গ্রামীণ জীবনের অপার শোভা? যাঁরা চেনা ঘরানা ভেঙে প্রকৃতিকে একটু অন্যভাবে ছুঁয়ে দেখতে চান, তাঁদের জন্যই রয়েছে এক নিঃশব্দ অথচ পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতার ঠিকানা — কুমিরমারী গ্রাম।
প্রকৃতির কোলে অবলম্বন — কোথায় এই কুমিরমারী?
গোসাবা ব্লকের অন্তর্গত এই ছোট্ট গ্রাম চারপাশে নদী ঘেরা এক দ্বীপ। রায়মঙ্গল, কুরানখালি, পুইজালি ও সারসা নদী এই দ্বীপটিকে মুড়ে রেখেছে। কুমিরমারী পৌঁছাতে জলপথই একমাত্র ভরসা, ফলে এখানকার যাত্রাই আলাদা এক রোমাঞ্চে ভরপুর। সুন্দরবনের মূল অংশের তুলনায় এই গ্রাম কম পরিচিত, কিন্তু কম সৌন্দর্যমণ্ডিত নয়।
যেখানে জীবন বয়ে চলে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে
চাষবাস, মাছ ধরা আর মৌমাছি পালন— এটাই এই গ্রামের জীবিকা। কোনও কৃত্রিমতা নেই, নেই শহরের কোলাহল। মাটির ঘর, কলার ছাউনি, নদীর ঘাটে নৌকা বাঁধা — এই ছবি যেন কোনও পুরনো বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে। গ্রামের খালবিল, ক্ষেতখামার, আর পথঘাট আপনাকে এক অদ্ভুত নির্ভরতায় জড়িয়ে রাখবে।
পর্যটনের জন্য নয়, অভিজ্ঞতার জন্য আসুন
কুমিরমারীতে বিশেষ কোনও ট্যুরিস্ট স্পট নেই, কিন্তু এখানকার সারল্য, স্বাভাবিকতা এবং নিঃশব্দতাই এই স্থানের মূল আকর্ষণ। এখানে গাছে ফলতে থাকা সবজি বা কলা দেখতে পাবেন চোখের সামনে। ছোটদের সঙ্গে নিয়ে গেলে তারা বইয়ের পাতার বাইরে প্রথমবার দেখে নিতে পারবে কীভাবে প্রকৃতি কাজ করে — কীভাবে মাটি থেকে উঠে আসে খাদ্য, কীভাবে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে বাঁচে।
একদিন গ্রামে, আরেকদিন নদীতে — পরিকল্পনার ছক
প্রথম দিন: গ্রাম চেনা
- স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে পরিচয়
- খেতের ধারে হাঁটাহাঁটি
- মৌচাক দেখা
- নদীর পাড়ে বসে নির্জনতাকে উপভোগ
দ্বিতীয় দিন: নৌকা যাত্রা ও ঝিঙেখালি বিট
- সকালবেলা নৌকা ভাড়া করে রায়মঙ্গল নদীতে যাত্রা
- ঝিঙেখালি বিট পৌঁছনো — এই জায়গাটি এখনও পর্যটকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় না হলেও মনোরম
- নজরমিনার থেকে ম্যানগ্রোভ জঙ্গল দেখা
- সময় থাকলে বুড়িরডাবরি ও হরিখালিও ঘুরে নেওয়া যায়
বাঘ-কুমির নয়, এবার গ্রামীণ সুখানুভূতির খোঁজে আসুন সুন্দরবনে
অনেকেই বলবেন, গ্রাম তো অন্য জায়গাতেও দেখা যায়। কিন্তু সুন্দরবনের মত বৈচিত্র্য ও রোমাঞ্চ আর কোথাও পাওয়া যায় না। এখানে বাঘ বা কুমির দেখার ভয় যতটা, রোমাঞ্চ ততটাই বেশি। জলের বুক চিরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকায় ভেসে চলা, সামনে গভীর বন, পাখির ডাক — এমন অভিজ্ঞতা একমাত্র সুন্দরবনই দিতে পারে।
যেখানে থাকার ব্যবস্থাও স্বাচ্ছন্দ্যের
কুমিরমারীতে এখন একটি ইকো রিসর্ট রয়েছে। রয়েছে আরও এক-দু’টি ছোট অতিথি নিবাস, যেখানে অগ্রিম বুকিং করে থাকা যায়। খাদ্য ব্যবস্থাও স্থানীয় — টাটকা সবজি, নদীর মাছ, গ্রামীণ রান্নার স্বাদে ভরপুর।
কীভাবে যাবেন কুমিরমারীতে?
গাড়িতে:
- কলকাতা থেকে সরাসরি গাড়িতে ধামাখালি পৌঁছতে হবে।
- সেখান থেকে নৌকা নিয়ে কুমিরমারী।
ট্রেনে:
- শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে ক্যানিং পর্যন্ত যাত্রা।
- ক্যানিং থেকে অটো বা বাসে ধামাখালি।
- এরপর নৌকায় কুমিরমারী।
নৌকা যাত্রাপথেই আপনি ম্যানগ্রোভ অরণ্যের অসাধারণ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।
কেন কুমিরমারী আপনার ভ্রমণ তালিকায় থাকবে?
- শহরের ব্যস্ততা থেকে মুক্তি
- নিখাদ, নির্ভেজাল গ্রামজীবনের স্বাদ
- শিশুদের জন্য শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা
- ম্যানগ্রোভ বন, নদী, এবং বন্যপ্রাণের অপরূপ মেলবন্ধন
- ঝিঙেখালি, হরিখালি, বুড়িরডাবরি — অল্প চেনা কিন্তু মনকাড়া স্থান ভ্রমণ
- স্থানীয় রান্না, প্রকৃতির নৈকট্য, অতিথিপরায়ণতা
শেষ কথা
সুন্দরবন মানেই শুধু বাঘ নয়। বরং এখানে লুকিয়ে আছে এমন একটি গ্রামীণ জগৎ, যা আপনাকে শিখিয়ে দিতে পারে কীভাবে সহজ জীবনেই লুকিয়ে থাকে প্রকৃত সুখ। তাই এবার সুন্দরবনের ব্যাঘ্রভয় বাদ দিয়ে কুমিরমারীর নিঃসঙ্গ শান্তির ডাক শুনে ফেলুন পা। প্রকৃতির কোলে দু’দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা আপনাকে নতুন জীবনচর্চার পথে নিয়ে যাবে।


