রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার এখন শহুরে জীবনের নিত্যদিনের অংশ। অফিস, বিমানবন্দর কিংবা মন্দির—এক ক্লিকেই গাড়ি এসে যায় দরজায়। কিন্তু সেই স্বাভাবিক পরিষেবার মাঝেই হঠাৎ যদি চ্যাটবক্সে ভেসে ওঠে অশালীন প্রস্তাব? সম্প্রতি এমনই এক ঘটনায় চমকে উঠেছে নেটদুনিয়া। উবের অ্যাপের চ্যাটবক্সে এক যাত্রীর অশোভন বার্তা ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
ঘটনাটি ঘটেছে হরিয়ানার গুরুগ্রামে। এক যুবক উবের চালক প্রতিদিনের মতোই গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বেরিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর একটি রাইড বুক হয়। যাত্রী মন্দিরে যাওয়ার জন্য গাড়ি ডাকেন। সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক—যতক্ষণ না চ্যাটবক্সে আসে এক অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন।
উবের অ্যাপে যাত্রী ও চালক ফোনকলের পাশাপাশি মেসেজের মাধ্যমেও যোগাযোগ করতে পারেন। সাধারণত লোকেশন, পিকআপ পয়েন্ট বা সময় সংক্রান্ত তথ্য নিয়েই কথা হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে যাত্রী কথোপকথন শুরু করেন “হ্যালো ব্রো” লিখে। চালকও হয়তো ভেবেছিলেন, স্বাভাবিক কোনো তথ্যই জানতে চাইবেন তিনি।
এর পরেই আসে চমক। যাত্রী সরাসরি লেখেন, “ব্রো, সেক্স করোগে?” অর্থাৎ, যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব। এমন প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবেই হতবাক হয়ে যান চালক। তিনি উত্তর হিসেবে শুধু একটি প্রশ্নচিহ্ন পাঠান, যেন নিশ্চিত হতে চান তিনি ঠিকই পড়েছেন কি না।
কিন্তু সেখানেই থামেননি ওই যাত্রী। তিনি আরও লেখেন, “রাজি থাকলে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর পাঠাও।” তারপর চাপ তৈরি করে বলেন, “হ্যাঁ বা না-এ উত্তর দাও।” পরিস্থিতি তখন অস্বস্তিকর থেকে সরাসরি অশোভন হয়ে ওঠে।
চালক স্পষ্টভাবে “না” লিখে জবাব দেন। তার পরপরই যাত্রী রাইড ক্যানসেল করে দেন। অর্থাৎ, প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়া মাত্রই তিনি পরিষেবা বাতিল করেন।
এই পুরো কথোপকথনের স্ক্রিনশট ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম কি এমন ব্যক্তিগত ও অশালীন প্রস্তাবের জায়গা? একজন পেশাদার চালকের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ কতটা গ্রহণযোগ্য?
ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই ওই যাত্রীকে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ চালককে পুলিশে অভিযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, এই ধরনের বার্তা শুধু অশালীন নয়, মানসিক হয়রানির সামিল।
আবার কিছু মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন—এটি কি নিছক মজা ছিল, নাকি পরিকল্পিত উস্কানি? তবে বেশিরভাগই মনে করছেন, যে কোনো পরিস্থিতিতেই এমন প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে একটি পেশাদার পরিষেবার প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের বার্তা অন্য ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
উবের, ওলা বা অন্য রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলো যাত্রী ও চালকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা নীতি অনুসরণ করে। অ্যাপে চ্যাটের সুবিধা দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র পরিষেবা সংক্রান্ত যোগাযোগের জন্য। কিন্তু যখন সেই মাধ্যম ব্যবহার করে অশালীন বা ব্যক্তিগত প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন তা পরিষ্কারভাবে নীতিভঙ্গের পর্যায়ে পড়ে।
এই ঘটনা দেখিয়ে দিল, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যতই উন্নত হোক, ব্যবহারকারীর আচরণই শেষ কথা। একজন চালক তার পেশাদার দায়িত্ব পালন করতে বেরিয়েছেন। সেখানে তাকে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হলে তা মানসিক চাপ তৈরি করতেই পারে।
ভাবুন তো, আপনি আপনার কাজ করছেন। হঠাৎ গ্রাহক আপনাকে এমন প্রস্তাব দিলেন, যার সঙ্গে আপনার কাজের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রথমে অবাক লাগবে, তারপর অস্বস্তি। ঠিক এমনই অবস্থায় পড়েছিলেন ওই যুবক চালক।
তিনি পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন শান্তভাবে। উত্তেজিত না হয়ে স্পষ্টভাবে ‘না’ বলেছেন। এতে বোঝা যায়, পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কীভাবে কঠিন পরিস্থিতিও সামলানো যায়। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রতিবার কি সবাই এতটা সংযত থাকতে পারবেন?
ডিজিটাল যুগে আমরা অনেক সময় ভুলে যাই, চ্যাটের ওপারে একজন বাস্তব মানুষ রয়েছেন। মজা বা কৌতূহলবশত পাঠানো একটি বার্তা অন্য কারও কাছে অপমানজনক বা ভয়ংকর হতে পারে।
রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার মানে শুধু গাড়ি বুক করা নয়, একটি পারস্পরিক সম্মান ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করা। সেই বিশ্বাস ভাঙলে পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই ব্যবহারকারীদের দায়িত্বশীল আচরণ করা জরুরি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বার্তা যদি প্রমাণসহ সামনে আসে, তবে তা আইনি অভিযোগের ভিত্তি হতে পারে। অনলাইন হয়রানি বা অশালীন প্রস্তাবের বিরুদ্ধে দেশে আইন রয়েছে। ফলে, ভুক্তভোগী চাইলে অভিযোগ জানাতে পারেন।
এই ঘটনায় অনেকেই পরামর্শ দিয়েছেন, চালকের উচিত প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করা এবং প্রয়োজনে পুলিশের দ্বারস্থ হওয়া। এতে ভবিষ্যতে এমন আচরণ রোধ করা সম্ভব হতে পারে।
গুরুগ্রামের এই উবের কাণ্ড শুধু একটি ভাইরাল ভিডিও নয়; এটি আমাদের অনলাইন আচরণের আয়না। প্রযুক্তি যত সহজ হচ্ছে, ততই বাড়ছে দায়িত্ব। একটি সাধারণ রাইড বুকিং থেকে এমন বিতর্ক তৈরি হওয়া প্রমাণ করে, ডিজিটাল যোগাযোগে সংযম ও সম্মান কতটা জরুরি।
মন্দিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া এই রাইড শেষ পর্যন্ত পৌঁছায়নি গন্তব্যে। কিন্তু ঘটনাটি পৌঁছে গেছে লাখো মানুষের কাছে। এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি এই ঘটনাকে শিক্ষা হিসেবে নেব, নাকি আবারও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি দেখব?


