ইংরেজি নববর্ষ মানেই এখন আর শুধু কেক কাটা, আতশবাজি বা পার্টি নয়। ২০২৬ সালের শুরুতেই ভারতে জন্ম নিয়েছে এক অদ্ভুত কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক নতুন ট্রেন্ড। টেবিলের তলায় বসে ঠিক ১২টা বাজার পর ১২টি সবুজ আঙুর খাওয়া। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এই রীতিই নতুন বছরের প্রথম দিনে ভারতের বহু মানুষের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
যারা বাজারে গিয়েছিলেন, তাঁরা হয়তো নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারেননি। সাধারণ দিনে যে সবুজ আঙুর অনায়াসে পাওয়া যায়, তা হঠাৎ করেই উধাও। বাজার ঘুরেও আঙুর মিলছে না। অনলাইনে অর্ডার দেওয়া যাচ্ছে না। সব কারণ একটাই, ১২টি আঙুর।
হঠাৎ উধাও সবুজ আঙুর, বিক্রেতারাও হতবাক
বিক্রেতাদের অনেকেই বুঝে উঠতে পারেননি কী ঘটছে। নববর্ষের আগে আঙুরের এমন চাহিদা আগে কখনও দেখা যায়নি। কেউ কিলো কিলো ফল কিনছেন না। বরং সবাই চাইছেন মাত্র ১২টি আঙুর। তাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে মজুত।
অনেক দোকানে দেখা গেছে, ক্রেতারা এসেই প্রথম প্রশ্ন করছেন, “১২টা আঙুর পাওয়া যাবে?” কেউ কেউ পুরো বাজার ঘুরে এক ডজন আঙুর খুঁজেও পাননি। আবার কেউ অনলাইনে অর্ডার দিয়ে দেখেছেন, কিন্তু সেখানেও সবুজ আঙুর ‘আউট অফ স্টক’ দেখাচ্ছে।
এই অদ্ভুত চাহিদা বিক্রেতাদেরও চমকে দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, আগে থেকে জানলে তাঁরা নিশ্চয়ই বাড়তি মজুত রাখতেন।
কেন ঠিক ১২টি আঙুর, আর কেন টেবিলের নিচে?
এই ট্রেন্ডের পেছনে রয়েছে একটি পুরনো ইউরোপীয় রীতি। নিয়মটা খুবই নির্দিষ্ট। ইংরেজি নববর্ষ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, অর্থাৎ রাত ১২টার পর, টেবিলের নিচে বসে একে একে ১২টি আঙুর খেতে হবে।
এই ১২টি আঙুর বছরের ১২টি মাসের প্রতীক। প্রতিটি আঙুর খাওয়ার সময় একটি করে ইচ্ছা বা কামনা মনে করতে হয়। বিশ্বাস করা হয়, এভাবে আঙুর খেলে নতুন বছরে সেই ইচ্ছাগুলো পূরণ হয়। অনেকেই একে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবেও দেখেন।
টেবিলের নিচে বসার বিষয়টি অনেকের কাছে রহস্যময় মনে হলেও, এই রীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রতীকী ভাবনা। এটি নাকি পুরনো বছরকে পেছনে রেখে নতুন বছরকে বিনয়ের সঙ্গে গ্রহণ করার একটি ইঙ্গিত।
স্পেন থেকে ভারতে, কীভাবে এল এই রীতি
এই রীতির জন্ম স্পেনে। ইতিহাস বলছে, ১৯০৯ সালে স্পেনে আঙুরের দারুণ ফলন হয়েছিল। এত বেশি আঙুর উৎপাদন হয় যে কৃষকরা তা বিক্রি করতে সমস্যায় পড়েন। তখনই নতুন বছরের রাতে ১২টি আঙুর খাওয়ার এই ধারণা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ধীরে ধীরে এটি স্পেনের নববর্ষ উদযাপনের একটি স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। সেখানে ঘড়িতে ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে, ঘণ্টাধ্বনির তালে তালে মানুষ আঙুর খায়। প্রতিটি ঘণ্টার শব্দের সঙ্গে একটি করে আঙুর।
দীর্ঘদিন ধরে এই রীতি স্পেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দৌলতে এখন তা সীমান্ত ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে ভারতে।
সোশ্যাল মিডিয়ার জোরেই ট্রেন্ডে ১২ আঙুর
ভারতে এই ট্রেন্ড ছড়িয়ে পড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সোশ্যাল মিডিয়া। ইনস্টাগ্রাম রিল, ইউটিউব শর্টস আর ফেসবুক পোস্টে এই রীতির ভিডিও ভাইরাল হতে শুরু করে।
অনেকেই ভিডিও দেখে কৌতূহলী হয়ে পড়েন। কেউ মজা করে, কেউ বিশ্বাস থেকে, আবার কেউ শুধু ট্রেন্ডের অংশ হতে গিয়েই বাজারে ছুটেছেন ১২টি আঙুর কিনতে।
এক বছর আগেও এই রীতি ভারতে তেমন নজর কাড়েনি। কিন্তু এবার যেভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই আঙুর-উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে অনেকেই একে নতুন বছরের সবচেয়ে অদ্ভুত ট্রেন্ড বলছেন।
বিশ্বাস না মজা, কেন মানুষ আগ্রহ দেখাচ্ছেন
সবাই যে অন্ধ বিশ্বাসে এই রীতি মানছেন, এমন নয়। অনেকেই একে হালকা মজার ছলে নিয়েছেন। নতুন বছরের রাতে বন্ধুদের সঙ্গে টেবিলের নিচে বসে আঙুর খাওয়া, হাসি-ঠাট্টা, ছবি তোলা—সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের আনন্দের অংশ হয়ে উঠেছে।
আবার কেউ কেউ সত্যিই বিশ্বাস করেন, নতুন বছরের শুরুটা যদি ইতিবাচক কোনও রীতির মাধ্যমে করা যায়, তাহলে মন ভালো থাকে। আর মন ভালো থাকলেই বছরটা ভালো কাটে, এমনটাই তাঁদের ধারণা।
বাজারে আঙুর সংকট, ক্ষুব্ধ ক্রেতাও কম নয়
এই হঠাৎ চাহিদার জেরে অনেক সাধারণ ক্রেতাই সমস্যায় পড়েছেন। যারা নিয়মিত আঙুর কিনতেন, তাঁরা হতাশ হয়েছেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, এত সামান্য চাহিদার জন্য পুরো বাজারে ফলের সংকট তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক।
তবে বিক্রেতারা বলছেন, এই চাহিদা খুবই সাময়িক। নববর্ষের রাত পেরোলেই আবার বাজার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
বিদেশি সংস্কৃতি ও ভারতীয় উদযাপন, নতুন মেলবন্ধন
ভারত এমনিতেই নানা সংস্কৃতির মিলনভূমি। এখানে নতুন রীতি খুব দ্রুত গ্রহণ করা হয়, আবার নিজের মতো করে বদলেও নেওয়া হয়। টেবিলের তলায় বসে ১২টি আঙুর খাওয়ার এই ট্রেন্ডও তারই উদাহরণ।
স্পেনের একটি শতাব্দী প্রাচীন রীতি আজ ভারতের নববর্ষ উদযাপনের অংশ হয়ে উঠেছে, অন্তত শহুরে একাংশের মধ্যে। কেউ একে দেখছেন কৌতূহল হিসেবে, কেউ দেখছেন বিশ্ব সংস্কৃতির মেলবন্ধন হিসেবে।
সাময়িক ট্রেন্ড, না কি স্থায়ী রীতি?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই ট্রেন্ড কি ভবিষ্যতেও টিকে থাকবে? নাকি এটি শুধু এবারের নববর্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় জন্ম নেওয়া অনেক ট্রেন্ডই ক্ষণস্থায়ী। তবে কিছু কিছু রীতি ধীরে ধীরে মানুষের জীবনে জায়গা করে নেয়। ১২টি আঙুর খাওয়ার এই রীতি কোন পথে যাবে, তা সময়ই বলবে।
এক ডজন আঙুরেই যত গল্প
মাত্র ১২টি সবুজ আঙুর। কিন্তু সেই আঙুরই এবার ইংরেজি নববর্ষে ভারতে তৈরি করেছে আলোচনা, কৌতূহল আর বাজারে হাহাকার। কেউ পেয়েছেন, কেউ পাননি। কেউ বিশ্বাস করেছেন, কেউ হেসেছেন।
তবু এটুকু নিশ্চিত, ২০২৬ সালের শুরুতে টেবিলের তলায় বসে আঙুর খাওয়ার গল্পটা অনেকদিন মানুষের মনে থেকে যাবে। কারণ নতুন বছরের শুরুটা কখনও কখনও এমন ছোট, অদ্ভুত ঘটনাই স্মরণীয় করে তোলে।


