সুশাসনের সংকটে বাংলাদেশ: বিএনপি মহাসচিবের উদ্বেগ
বাংলাদেশে বর্তমানে সুশাসনের চরম সংকট চলছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার মতে, প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং অব্যবস্থাপনার ফলে সাধারণ জনগণ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। তিনি বলেন, “দেশে কোথাও কোনো সুশাসন নেই, আর নিয়ন্ত্রণের চিহ্নমাত্র দেখা যাচ্ছে না।”
তিনি অভিযোগ করেন, আগে যেখানে কোনো ব্যবসায়ীকে চাঁদা দিতে হতো তিন লাখ টাকা, এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ টাকায়। এই চাঁদাবাজি প্রশাসনের অগোচরে নয় বরং এর পৃষ্ঠপোষকতায় হচ্ছে বলেও ইঙ্গিত দেন ফখরুল। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে এখনো তেমন কোনো গঠনমূলক পরিবর্তন আসেনি, যা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে পারে।
অর্থনীতি, শাসন ও ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ
এই বক্তব্য তিনি দিয়েছেন ঢাকায় আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে। ড. হোসেন জিল্লুর রহমান রচিত ‘অর্থনীতি, শাসন ও ক্ষমতা: যাপিত জীবনের আলেখ্য’ শীর্ষক বইটির মোড়ক উন্মোচন ও আলোচনাসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মির্জা ফখরুল দেশের চলমান শাসনব্যবস্থার ত্রুটিগুলো তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন লেখক নিজেই এবং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। আলোচনায় উঠে আসে, কীভাবে অর্থনৈতিক নীতি, প্রশাসনিক শাসন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে।
সংস্কারের আহ্বান: গণতন্ত্র ছাড়া পথ নেই
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “রাতারাতি কোনো সংস্কার সম্ভব নয়। সময় লাগবেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা গণতান্ত্রিক চর্চা পরিহার করব। বসে থাকলে হবে না, পরিবর্তনের জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।”
তিনি মনে করেন, সংস্কার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তবে এই প্রক্রিয়ায় কোনো চাপিয়ে দেওয়া নীতিমালা কার্যকর হলে সেটি ফলপ্রসূ হবে না। বরং গণতান্ত্রিক উপায়ে, জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচন ও সংসদে পাঠিয়েই কাঙ্ক্ষিত সংস্কার সম্ভব।
ট্যারিফের শঙ্কা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির প্রভাব
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, “ট্রাম্পের ট্যারিফ নীতি আমাদের জন্য একটি বড় সংকট হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের সরকারের উচিত হবে আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া।”
বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই রপ্তানিনির্ভর। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতিতে পরিবর্তন এলে তার বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাই শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়েই নয়, আন্তর্জাতিক বিষয়েও সদা সতর্ক থাকতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক দল ও জনসেবার ইতিবাচক ভূমিকা
বিএনপি মহাসচিবের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত জনসেবা ও দেশের উন্নয়ন। তিনি বলেন, “জনগণের কল্যাণে কাজ করাই একটি রাজনৈতিক দলের মূল দায়িত্ব। সেজন্য জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য।”
তার মতে, যদি রাজনীতির চর্চা শুধুই ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তা কখনোই জনকল্যাণে রূপ নিতে পারে না।
গণতন্ত্রে ফিরলেই সম্ভব পরিবর্তন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামগ্রিক বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে গণতান্ত্রিক পথেই অগ্রসর হতে হবে। চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত, চাঁদাবাজি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি করছে, যার পরিণাম ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। এজন্য দরকার অবিলম্বে একটি সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা।
সুশাসনের জন্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন জনগণের অংশগ্রহণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। তবেই একটি সত্যিকারের উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।


