মানুষের মনের গোপন কথাও কি পড়ে ফেলতে পারবে যন্ত্র? এই প্রশ্নই এখন বিজ্ঞান জগতের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন এক প্রযুক্তির সন্ধান, যা মস্তিষ্কে বসানো ইলেকট্রনিক চিপের সাহায্যে মানুষের মনে মনে ভাবা শব্দ বা বাক্য প্রায় নির্ভুলভাবে কম্পিউটারের মাধ্যমে প্রকাশ করতে সক্ষম।
গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক জার্নাল ‘সেল’-এ প্রকাশিত হয়েছে এই গবেষণার ফলাফল। যেসব ব্যক্তি স্নায়ুবিক রোগে আক্রান্ত হয়ে কথা বলার ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়েছেন, তাঁদের উপরই চালানো হয় এই পরীক্ষা। বিশেষ করে অ্যামিয়োট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস (ALS) রোগীরা এতে অংশ নেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিশ্বের বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং-ও এ রোগে আক্রান্ত ছিলেন।
মানব মস্তিষ্কে স্থাপন করা ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক চিপ স্নায়ুর সিগন্যাল সংগ্রহ করে। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সেই সিগন্যালকে রূপান্তরিত করে শব্দ বা বাক্যে প্রকাশ করে। ধরুন, কেউ মনে মনে বললেন “আপেল”। সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্র সেটি শনাক্ত করে কম্পিউটারের পর্দায় লিখে দিতে পারে—“আপেল”।
গবেষণার সময় কেসি হ্যারেল নামের এক রোগীর মস্তিষ্কের ভেতরে ভাবা প্রায় ছয় হাজার শব্দ যন্ত্রটি সঠিকভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। প্রথমে অংশগ্রহণকারীদের নির্দিষ্ট শব্দ যেমন “ঘুড়ি” বা “দিন” মনে মনে বলতে বলা হয়েছিল। কম্পিউটার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্ভুল ফলাফল দিয়েছে। পরবর্তী ধাপে তাঁদের সম্পূর্ণ বাক্য ভাবতে বলা হলে সেগুলিও প্রায় নিখুঁতভাবে লিখে দেয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিস্ট এরিন কুনজ় জানান, “আসলে ভাষা না হলেও ভাবনার জন্য এক ধরনের ভাষাগত কাঠামো দরকার। সেই সিগন্যালগুলোই যন্ত্র ধরে ফেলছে।”
তবে প্রশ্ন উঠছে—যন্ত্র কি মানুষের অজানা বা গোপন চিন্তাও পড়ে ফেলতে পারবে? বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এখনও তা সম্ভব নয়। এর জন্য স্বেচ্ছায় মনের দরজা খুলে দিতে হয়। এজন্য ব্যবহার করা হয়েছিল একটি বিশেষ পাসওয়ার্ড পদ্ধতি।
অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়েছিল, নির্দিষ্ট শব্দবন্ধ “চিটি চিটি ব্যাং ব্যাং” উচ্চারণ করার পরেই যন্ত্র যেন তাঁদের মনে উঁকি দেয়। এটি ছিল একপ্রকার সংকেত বা পাসওয়ার্ড। অর্থাৎ ব্যক্তি নিজে অনুমতি না দিলে যন্ত্র মনের কথা পড়তে পারবে না।
অস্ট্রেলিয়ার ওলংগং বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োএথিসিস্ট মার্কাস লিয়োনেল ব্রাউন বলেন, “এই প্রযুক্তি সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে রোগীরা নিজের ইচ্ছেমতো যন্ত্রকে মনের কথা জানাতে পারবেন। এটি ভবিষ্যতে বিকলাঙ্গ বা বাকরুদ্ধ ব্যক্তিদের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে।”
তবে যখন অংশগ্রহণকারীদের ছোটবেলার প্রিয় বন্ধুর কথা ভাবতে বলা হয়েছিল, তখন যন্ত্র স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেনি। কারণ, এ ধরনের প্রশ্নে একাধিক স্মৃতি বা মুখ একসাথে ভিড় করে আসে। ফলে যন্ত্র বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
নেদারল্যান্ডসের মাস্ট্রুখ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিস্ট ক্রিস্টান হার্ফ বলেন, “এই আবিষ্কার শুধু প্রযুক্তির সীমারেখায় আবদ্ধ নয়, বরং ভাষা ও মানবচিন্তার মধ্যে গভীর সম্পর্ক নিয়েও নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।”
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্নায়ুবিজ্ঞানের যুগলবন্দীতে মানুষের মনের ভাবনা পড়ে ফেলার যন্ত্র এখন আর কল্পকাহিনি নয়, বরং বাস্তবতার কাছাকাছি। যদিও এখনও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে ভবিষ্যতে এটি বাকহীন রোগীদের যোগাযোগের এক অসাধারণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। বিজ্ঞানীরা আশাবাদী, এই প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।


