শীত নামলেই ভারতের আকাশ, জলাশয় আর বনাঞ্চলে এক আলাদা প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। হঠাৎ করে ভিড় জমাতে শুরু করে নানা রঙের, নানা প্রজাতির অচেনা পাখি। এরা কেউ আসে রাশিয়া থেকে, কেউ মঙ্গোলিয়া, কেউ আবার ইউরোপের দূর দেশ পেরিয়ে। হাজার হাজার কিলোমিটার পথ উড়ে তারা ঠিক ভারতে এসে থামে। প্রশ্ন একটাই—কেন? পৃথিবীতে তো আরও অনেক দেশ আছে। তবুও শীতের ঠিকানা হিসেবে ভারতই কেন পরিযায়ী পাখিদের সবচেয়ে প্রিয়?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে প্রকৃতি, আবহাওয়া আর খাদ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে।
শীত শুরু হতেই কেন দেশ ছাড়ে পাখিরা
উত্তর গোলার্ধে শীত মানেই তীব্র ঠান্ডা। রাশিয়া, মঙ্গোলিয়া, মধ্য এশিয়া কিংবা ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তখন ভারী তুষারপাত শুরু হয়। চারদিক ঢেকে যায় বরফে। গাছের পাতা ঝরে যায়, জলাশয় জমে যায় বরফে। এই পরিস্থিতিতে পাখিদের জন্য খাবার জোগাড় করা ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে।
ছোট পোকামাকড় পাওয়া যায় না। ফল, বীজও বরফে ঢাকা পড়ে যায়। শুধু তাই নয়, ডিম পাড়া বা ছানাদের বড় করাও হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। ঠান্ডা হাওয়ায় অনেক সময় ছানারা বাঁচতেই পারে না। তাই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে তারা উড়ে যায় উষ্ণ এলাকার খোঁজে।
সেন্ট্রাল এশিয়ান ফ্লাইওয়ে আর ভারতের ভূমিকা
পরিযায়ী পাখিদের যাত্রা কোনও এলোমেলো উড়ান নয়। তাদের রয়েছে নির্দিষ্ট পথ, যাকে বলা হয় ‘ফ্লাইওয়ে’। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো সেন্ট্রাল এশিয়ান ফ্লাইওয়ে। এই পথ ধরেই উত্তর এশিয়া ও ইউরোপের বহু পাখি দক্ষিণে পাড়ি জমায়।
এই ফ্লাইওয়ের মাঝখানেই পড়ে ভারত। ফলে প্রাকৃতিক ভাবেই ভারত হয়ে ওঠে তাদের নিরাপদ বিশ্রামস্থল। এখানে এসে তারা শুধু বিশ্রামই নেয় না, বরং পুরো শীতকালটাই কাটিয়ে দেয় আরাম করে।
ভারতের আবহাওয়া কেন পাখিদের কাছে স্বর্গ
শীতকালে ভারতের আবহাওয়া তুলনামূলক ভাবে অনেকটাই সহনীয়। এখানে সেই হাড়কাঁপানো ঠান্ডা নেই। বরফ পড়ে না। দিনের বেলায় রোদ থাকে, রাতে ঠান্ডা থাকলেও তা পাখিদের জন্য প্রাণঘাতী নয়।
এই উষ্ণ ও স্থিতিশীল আবহাওয়া পাখিদের শরীরের জন্য আদর্শ। দীর্ঘ উড়ানের পর তারা এখানে এসে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকিও অনেক কমে যায়।
খাবারের অফুরান ভাণ্ডার
পরিযায়ী পাখিদের কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো খাবার। শীতকালে ভারতে খাবারের কোনও অভাব নেই। মাঠে-ঘাটে, গাছে-ঝোপে প্রচুর ফল, বীজ আর পোকামাকড় পাওয়া যায়। জলাশয়ে থাকে মাছ, শামুক আর নানা জলজ প্রাণী।
ভারতের নদী, হ্রদ, বিল, পুকুর আর জলাভূমিগুলো শীতকালে পাখিদের স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠে। চিলিকা, ভরতপুর, সুন্দরবন, দীঘা, সুলতানপুর—এই সব জায়গায় শীত এলেই পরিযায়ী পাখির মেলা বসে যায়।
জলাশয়ের প্রাচুর্য একটি বড় কারণ
অনেক পরিযায়ী পাখিই জলচর। তাদের বাঁচার জন্য জলাশয় দরকার। ভারত এই দিক থেকে ভীষণ ভাগ্যবান। ছোট বড় অসংখ্য নদী, হ্রদ, জলাভূমি রয়েছে এখানে। শীতকালেও অধিকাংশ জলাশয়ে জল থাকে, বরফে জমে যায় না।
ফলে পান করার জল, স্নান করা, খাবার সংগ্রহ—সব কিছুই সহজ হয় পাখিদের জন্য। এই সুবিধা পৃথিবীর সব দেশে নেই।
নিরাপদ আশ্রয় ও গাছপালার প্রাচুর্য
ভারতে এখনও বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, গ্রামাঞ্চল আর জলাভূমি রয়েছে যেখানে মানুষের আনাগোনা তুলনামূলক কম। এই জায়গাগুলো পরিযায়ী পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় দেয়। গাছপালা বেশি থাকায় তারা সহজেই বসার জায়গা পায়, বাসা বাঁধতে পারে।
বিশেষ করে ছানাদের বড় করার জন্য এই নিরাপত্তা খুব জরুরি। শিকারি প্রাণী আর তীব্র ঠান্ডা থেকে দূরে থাকা তাদের বাঁচিয়ে রাখে।
প্রজননের জন্যও উপযোগী পরিবেশ
অনেক পরিযায়ী পাখি শুধু শীত কাটাতেই নয়, প্রজননের জন্যও ভারতে আসে। এখানে পর্যাপ্ত খাবার আর নিরাপদ পরিবেশ থাকায় তারা ডিম পাড়ে এবং ছানাদের বড় করে।
ছানারা শক্তিশালী হলে বসন্তের শুরুতে তারা আবার ফিরে যায় নিজেদের মূল দেশে। এই চক্র যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।
কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী—সবখানেই পাখির মেলা
ভারতের প্রায় সব রাজ্যেই শীতকালে পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে। কাশ্মীরের ডাল লেক থেকে শুরু করে রাজস্থানের মরুভূমির জলাশয়, পশ্চিমবঙ্গের নদী-খাল, ওড়িশার উপকূল, কর্ণাটকের হ্রদ—সব জায়গাতেই তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে।
এই বৈচিত্র্যই ভারতকে পাখিদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। এক দেশেই তারা পায় পাহাড়, সমতল, বন, নদী আর সমুদ্র।
বছরে কত প্রজাতির পাখি আসে ভারতে
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি বছর শীতকালে প্রায় ২ হাজার প্রজাতির পরিযায়ী পাখি ভারতে আসে। এর মধ্যে রয়েছে সাইবেরিয়ান ক্রেন, ফ্লেমিঙ্গো, বার-হেডেড গুজ, পিনটেল ডাক, গডউইটসহ অসংখ্য প্রজাতি।
এদের কেউ কয়েক মাস থাকে, কেউ আবার পুরো শীতটাই কাটিয়ে দেয় এখানে। বসন্ত এলেই তারা আবার দীর্ঘ যাত্রায় ফিরে যায় নিজেদের দেশে।
শীতে পরিযায়ী পাখিদের ভারতে আসার পেছনে কোনও একক কারণ নেই। বরং আবহাওয়া, খাবার, জল, নিরাপত্তা আর ভৌগোলিক অবস্থান—সব মিলিয়েই ভারত তাদের কাছে আদর্শ আশ্রয়স্থল। তাই যুগ যুগ ধরে শীত এলেই আকাশে ডানা মেলে তারা ছুটে আসে এই দেশে।
পরিযায়ী পাখিদের এই আগমন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, আমাদের পরিবেশের সুস্থতারও বার্তা দেয়। তাদের রক্ষা করা মানে প্রকৃতিকে রক্ষা করা। আর সেটাই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় চমকপ্রদ সত্য।


