পৃথিবীর জলবায়ু আজ এক চরম সংকটের মুখে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন শুধু একটি বৈজ্ঞানিক শব্দ নয়, এটি এখন আমাদের চোখের সামনে ঘটে চলা বাস্তবতা। পাহাড়ের মাথায় জমে থাকা হাজার হাজার বছরের বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই গতি বজায় থাকলে খুব শিগগিরই পৃথিবী বছরে প্রায় ৩০০০ হিমবাহ হারাতে পারে। এই আশঙ্কা এখন আর ভবিষ্যতের গল্প নয়, বরং আসন্ন বাস্তবতা।
হিমবাহ গলনের বর্তমান চিত্র
গত দুই দশকে পৃথিবী ইতিমধ্যেই কমপক্ষে চার হাজার হিমবাহ হারিয়েছে। বর্তমানে গড়ে প্রতি বছর প্রায় এক হাজার হিমবাহ গলে নদী, হ্রদ বা সমুদ্রে মিশে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগামী দেড় দশকের মধ্যেই এই হার তিন গুণ বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ ২০৪০ সালের মধ্যেই বছরে প্রায় তিন হাজার হিমবাহ নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
ভাবুন তো, পাহাড়ে বরফ মানেই শুধু সুন্দর দৃশ্য নয়। এই বরফই বহু নদীর জন্ম দেয়, বহু মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। কিন্তু সেই বরফ যদি দ্রুত হারিয়ে যায়, তাহলে তার প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, তা বোঝা কঠিন নয়।
গবেষণায় কী উঠে এসেছে
সুইৎজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ল্যান্ডার ভন ত্রিচ এবং তাঁর সহযোগীরা হিমবাহের উপর উষ্ণায়নের প্রভাব নিয়ে বড় আকারের গবেষণা করেছেন। তাঁরা জলবায়ু সংক্রান্ত একাধিক আধুনিক মডেল ব্যবহার করে আগামী একশো বছরে বিশ্বের দুই লক্ষেরও বেশি হিমবাহের ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ করেছেন।
এই গবেষণায় দেখা গেছে, কার্বন নিঃসরণ যতই নিয়ন্ত্রণে আনা হোক না কেন, ইতিমধ্যেই যে ক্ষতি হয়ে গেছে, তা পুরোপুরি ঠেকানো প্রায় অসম্ভব। কিছু হিমবাহ বাঁচানো যেতে পারে, কিন্তু বিপুল সংখ্যক হিমবাহ হারানো প্রায় নিশ্চিত।
শিল্পায়ন ও উষ্ণায়নের সম্পর্ক
বিশ্বব্যাপী শিল্পায়নের ব্যাপক প্রসার শুরু হয়েছিল ১৮৫০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা এই সময়ের আগের তাপমাত্রাকেই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের আদর্শ মাপকাঠি হিসেবে ধরেন। তখন পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ছিল তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।
কিন্তু শিল্প বিপ্লবের পর থেকে কারখানা, যানবাহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত বেড়েছে। এর ফলেই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের হার আজ বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে।
প্যারিস চুক্তি ও বাস্তবতা
২০১৫ সালে বিশ্ব উষ্ণায়ন মোকাবিলার জন্য প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। লক্ষ্য ছিল, বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা, অথবা অন্তত ২ ডিগ্রির নিচে নামিয়ে আনা।
কিন্তু এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। বর্তমান গতিতে উষ্ণায়ন চলতে থাকলে চলতি শতাব্দীর মধ্যেই পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন।
বিভিন্ন উষ্ণায়ন পরিস্থিতিতে হিমবাহের ভবিষ্যৎ
যদি উষ্ণায়ন ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তাহলে ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৭৯ শতাংশ হিমবাহ গলে যাবে। এমনকি উষ্ণায়ন ২ ডিগ্রির মধ্যে সীমিত রাখলেও পরিস্থিতি খুব একটা ভালো হবে না। সে ক্ষেত্রেও প্রায় ৬৩ শতাংশ হিমবাহ হারিয়ে যাবে পৃথিবী থেকে।
আর যদি উষ্ণায়ন ৪ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে পৃথিবী কার্যত ‘বরফশূন্য’ হয়ে পড়তে পারে। এই অবস্থায় প্রায় ৯১ শতাংশ হিমবাহই নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও উদ্যোগ
জলবায়ু সংকট যে কতটা গুরুতর, তা আন্তর্জাতিক মহলও স্বীকার করছে। রাষ্ট্রপুঞ্জ ২০২৫ সালকে ‘আন্তর্জাতিক হিমবাহ সংরক্ষণ বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্তই স্পষ্ট করে দেয়, বিষয়টি আর উপেক্ষা করার মতো নয়।
দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলায় ইতিমধ্যেই প্রায় সব হিমবাহ হারিয়ে গেছে। দেশটির শেষ অবশিষ্ট হিমবাহটিও এখন বিলুপ্তির পথে। এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ
হিমবাহ গলে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার উপর। বিজ্ঞানীদের মতে, চলতি শতাব্দীতে শুধু হিমবাহ গলনের কারণেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এ ছাড়া হিমবাহ-নির্ভর নদীগুলির জলপ্রবাহ কমে গেলে সেচব্যবস্থা ব্যাহত হবে। পাহাড়ি এলাকায় গ্লেসিয়াল লেক থেকে হঠাৎ জল বেরিয়ে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কাও বাড়বে। ২০২৩ সালে সিকিমে দক্ষিণ লোনাক হিমবাহের হ্রদ ভেঙে যে বন্যা হয়েছিল, তাতে ৫৫ জনের মৃত্যু হয়। এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।
এখনও কি কিছু করা সম্ভব
গবেষক ডেভিড রাউন্সের মতে, আমরা অনেক হিমবাহ হারাতে চলেছি, কিন্তু সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। বড় হিমবাহগুলির বরফ গলতে বেশি সময় লাগে, তাই সঠিক উদ্যোগ নিলে কিছু হিমবাহ এখনও রক্ষা করা সম্ভব।
যদি উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমিত রাখা যায়, তবুও শতাব্দীর শেষে প্রায় ৫৫ শতাংশ হিমবাহ হারিয়ে যাবে। তবে এর মানে এই নয় যে চেষ্টা থামিয়ে দেওয়া উচিত। বরং এখনই কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ করা জরুরি।


