মানুষ সাধারণত বিয়ে নিয়ে ভাবে উৎসব, গান, সাজসজ্জা আর আত্মীয়-স্বজনের ভিড়। কিন্তু মানিকগঞ্জে ঘটেছে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। মাথায় বরসাজ টোপর, হাতে-পায়ে ব্যান্ডেজ, আর বেডে শুয়ে থাকা নতুন বর আনন্দ সাহা। আর তাকে প্রদক্ষিণ করছেন নববধূ অমৃতা সরকার, পাশে পরিবারের সদস্য, পুরোহিতের মন্ত্র, আর উলুধ্বনি। এই পুরো আয়োজন হয়েছে হাসপাতালের ভেতরেই।
এই দৃশ্য দেখে চিকিৎসক থেকে শুরু করে রোগী পর্যন্ত সবাই হয়েছেন সাক্ষী। এমনকি বৃহস্পতিবার রাতে বিয়ের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়।
আনন্দ সাহা মানিকগঞ্জ শহরের চানমিয়া লেনের বাসিন্দা। গত ৭ আগস্ট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে পেঁয়াজ বোঝাই ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় তার মোটরসাইকেলের। গুরুতর আহত হয়ে দুই হাত, ডান পা ও কোমরের হাড় ভেঙে যায় তার।
প্রথমে তাকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রায় ২০ দিন চিকিৎসার পর তাকে আনা হয় মানিকগঞ্জের আফরোজা বেগম জেনারেল হাসপাতালে। এখনও পুরোপুরি সুস্থ হতে তার আরও কয়েক মাস সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
কিন্তু এর মধ্যেই সামনে এসে পড়ে আগে থেকে ঠিক হওয়া বিয়ের তারিখ। তাই পরিবারের সদস্যরা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেন—হাসপাতালেই আয়োজন করা হবে মালাবদল।
আনন্দ সাহার সঙ্গে অমৃতা সরকারের পরিচয় ও প্রেম প্রায় এক বছরের পুরনো। গত জুলাই মাসে দুই পরিবারের সিদ্ধান্তে তাদের আশীর্বাদ অনুষ্ঠান হয়। ডিসেম্বরে জমকালো বিয়ে করার পরিকল্পনা ছিল সবার।
কিন্তু দুর্ঘটনার পর আনন্দের বাবা-মায়ের শারীরিক অসুস্থতা আর পরিবারের দেখাশোনার সমস্যার কারণে তারিখ এগিয়ে আনা হয়। শেষমেশ চারই সেপ্টেম্বর বিয়েটা সেরে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়।
আনন্দের কাকাতো ভাই অমি সাহা বলেন, “ভাইয়ের পাশে কেউ থাকা দরকার ছিল। নতুন বৌদি আর ভাই দুজনেই চেয়েছে একে অপরের পাশে থাকতে। তাই পরিবারের সবাই মিলে ধর্মীয় নিয়ম মেনে হাসপাতালে সীমিত পরিসরে বিয়েটা সম্পন্ন করি।”
প্রথমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিতে চাননি। কারণ অন্য রোগীদের অসুবিধার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু পরিবারের অনুরোধে চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে শেষ পর্যন্ত অনুমতি মেলে।
হাসপাতালের মেডিকেল এন্ড ইউনিট প্রধান ডা. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “রোগীর কেবিনে বিয়ে করার অনুরোধ এসেছিল। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে আমরা অব্যবহৃত একটি ফ্লোর পরিষ্কার করে সেখানে আয়োজনের সুযোগ দিয়েছি। আসলে আমরাও মনে করেছি, পরিবারের এই চাওয়া পূরণ করা উচিত।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা যারা উপস্থিত ছিলাম, মনে হচ্ছিল যেন আমরাও বিয়ের অংশ। হাসপাতালের ভেতরেও সবাই আনন্দে ভরে উঠেছিল।”
যেখানে হাসপাতালে কেবল কষ্ট আর চিকিৎসার গল্প শোনা যায়, সেখানে এমন ব্যতিক্রমী বিয়ের আয়োজন সত্যিই এক অন্যরকম অনুভূতি এনে দিয়েছে সবার মাঝে। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনরা লিখছেন—ভালোবাসার টানে কোনো প্রতিবন্ধকতাই থামাতে পারে না মানুষকে।
আনন্দ ও অমৃতার এই হাসপাতাল-বিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অনেকে একে দেখছেন ভালোবাসার জয়ের গল্প হিসেবে।
জীবনের কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোই সত্যিকারের সম্পর্কের প্রমাণ। আনন্দ সাহা ও অমৃতা সরকারের হাসপাতাল-বিয়ে সেটাই আবারও মনে করিয়ে দিল। দুর্ঘটনা ভেঙে দিতে পারেনি তাদের সম্পর্ক, বরং আরও দৃঢ় করেছে।
এই গল্প হয়তো অনেকের কাছে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু আসলে এটাই জীবনের বাস্তবতা—ভালোবাসা সব জায়গাতেই জায়গা করে নেয়, এমনকি হাসপাতালের বেডেও।


