কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনে এবারের নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। তার এই জয় শুধু ভোটের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অনেকের কাছে এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীকী বিজয় হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ফলাফল প্রকাশের পর দেশ-বিদেশে আলোচনার ঝড় ওঠে। বিশেষ করে লেখিকা তসলিমা নাসরিন সামাজিক মাধ্যমে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে স্যালুট জানান, যা বিষয়টিকে আরও আলোচনায় নিয়ে আসে।
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে লড়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী রোকন রেজা শেখ। বেসরকারি ফলাফলে দেখা যায়, ১৫০টি ভোটকেন্দ্রের গণনা শেষে ফজলুর রহমান ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৪ ভোট। অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে রোকন রেজা পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৩২৬ ভোট। অর্থাৎ প্রায় ৭২ হাজার ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন ফজলুর রহমান।
এই আসনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা—ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম—মিলিয়ে গঠিত হয়েছে কিশোরগঞ্জ-৪। ইটনা উপজেলায় ফজলুর রহমান পেয়েছেন ৫৪ হাজার ২৮৯ ভোট, যেখানে রোকন রেজা পেয়েছেন ২০ হাজার ৯৩৯ ভোট। এখানেই ব্যবধান ছিল সবচেয়ে বেশি।
মিঠামইনে ফজলুর রহমান পেয়েছেন ২৬ হাজার ৭৫৬ ভোট। রোকন রেজা সেখানে পেয়েছেন ২২ হাজার ৪৫১ ভোট। অর্থাৎ এই উপজেলায় লড়াই কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও শেষ পর্যন্ত এগিয়ে ছিলেন বিএনপি প্রার্থীই। অষ্টগ্রাম মিলিয়েও সার্বিক ব্যবধানে জয় তার দিকেই গেছে।
ভোটের এই ফলাফল প্রমাণ করে যে, স্থানীয় ভোটারদের বড় একটি অংশ ফজলুর রহমানের পক্ষে একতাবদ্ধ হয়েছেন। বিশেষ করে ইটনা অঞ্চলে তার জনপ্রিয়তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ভোটের বাক্সে।
ফলাফল ঘোষণার পর ফজলুর রহমান বলেন, তিনি তার আসনের মানুষের প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এলাকাবাসী যে সম্মান ও আস্থা তার ওপর রেখেছেন, তা রক্ষা করার চেষ্টা করবেন বলেও জানান তিনি।
তার কথায় এক ধরনের আবেগ ছিল। যেন দীর্ঘ পথচলার পর আবারও মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার অতীত সংগ্রাম এবং বর্তমান রাজনৈতিক লড়াই—দুটোই যেন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গেল এই বিজয়ে।
নির্বাচনের আগে নানা ধরনের চাপ ও হুমকির মুখে পড়েছিলেন ফজলুর রহমান—এমন অভিযোগ স্থানীয়ভাবে শোনা গেছে। তবে তিনি পিছু হটেননি। বরং প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশে অংশ নিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন এবং নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।
অনেকেই বলছেন, তার এই দৃঢ় অবস্থানই ভোটারদের আস্থা বাড়িয়েছে। সাধারণ মানুষ এমন একজন প্রার্থীকে বেছে নিতে চেয়েছেন, যিনি চাপের মুখেও নিজের বিশ্বাস থেকে সরে দাঁড়ান না।
রাজনীতির মাঠে আমরা প্রায়ই দেখি নানা সমীকরণ, জোট আর হিসাব-নিকাশ। কিন্তু কখনও কখনও ভোট হয়ে যায় আবেগেরও। এই আসনের ফলাফল অনেকের কাছে ঠিক তেমনই এক প্রতীকী সিদ্ধান্ত।
ফলাফল প্রকাশের পর লেখিকা তসলিমা নাসরিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফজলুর রহমানকে অভিনন্দন জানান। তিনি তার পোস্টে উল্লেখ করেন, যখন দেশে নানা সহিংসতা ও উগ্রতার অভিযোগ উঠছে, তখন এমন পরিবেশে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া সহজ নয়। সেই কঠিন সময়েও ফজলুর রহমান পিছু হটেননি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তসলিমা তার লেখায় আরও বলেন, এই বিজয় শুধু একজন প্রার্থীর জয় নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পক্ষে অবস্থান নেওয়া মানুষের জয়। তিনি ফজলুর রহমানকে “আদর্শবান ও সাহসী” মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে তাকে স্যালুট জানান।
তার এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে সমর্থন জানিয়েছেন, কেউ কেউ ভিন্নমতও প্রকাশ করেছেন। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই নির্বাচন ফলাফল ঘিরে আলোচনা থামেনি।
কিশোরগঞ্জ-৪ আসন দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হাওর অঞ্চল হওয়ায় এখানকার মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যোগাযোগ সমস্যা এবং উন্নয়ন ঘাটতির মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। ফলে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও অতীত ভূমিকা এখানে বড় ভূমিকা রাখে।
ফজলুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের পরিচয় এবং স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের উপস্থিতি তাকে আলাদা সুবিধা দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। অন্যদিকে রোকন রেজা শেখও নিজস্ব সমর্থনভিত্তি নিয়ে মাঠে ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটের ব্যবধান দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই নির্বাচনে জনমত একদিকে বেশি ঝুঁকেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” একটি শক্তিশালী শব্দবন্ধ। এটি শুধু ইতিহাসের স্মৃতি নয়; বরং আদর্শ, মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক অবস্থানেরও প্রতীক। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের এই ফলাফলকে অনেকেই সেই প্রেক্ষাপটেই দেখছেন।
যখন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা বড় ব্যবধানে জয় পান, তখন বিষয়টি শুধু দলীয় রাজনীতির সীমায় আটকে থাকে না। এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের বার্তা। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তাতে বোঝা যায়—এই জয় অনেকের কাছে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে ফজলুর রহমান কীভাবে তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন। হাওর অঞ্চলের উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষি ও মৎস্য খাতের উন্নতি—এসব বিষয়েই মানুষ প্রত্যাশা করে। শুধু আদর্শ নয়, বাস্তব উন্নয়নও দেখতে চান ভোটাররা।
নিজের বক্তব্যে তিনি যে সম্মান রক্ষার কথা বলেছেন, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ মানুষ যখন এত বড় ব্যবধানে কাউকে নির্বাচিত করে, তখন তাদের প্রত্যাশাও থাকে অনেক বেশি।
সব মিলিয়ে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের এবারের নির্বাচন ফলাফল রাজনীতির অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। ফজলুর রহমানের বিপুল জয়, রোকন রেজার পরাজয় এবং তসলিমা নাসরিনের প্রকাশ্য অভিনন্দন—সবকিছু মিলিয়ে এটি এখন একটি আলোচিত রাজনৈতিক অধ্যায়। সময়ই বলবে, এই বিজয় কতটা পরিবর্তন বয়ে আনে এলাকার মানুষের জীবনে।


