সময় যতই এগিয়েছে, যোগাযোগের মাধ্যম বদলেছে। এখন ইন্টারনেট, ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু ১৯৫৩ সালের সেই সময়ে যোগাযোগের প্রধান ভরসা ছিল ডাক বিভাগ। খামে ভরা চিঠি, ইনল্যান্ড লেটার, পোস্টকার্ড — দূরে থাকা মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখার একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায় ছিল এই কাগুজে বার্তাই।
সেই সময়ের এক বিস্ময়কর ঘটনার কথা সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে। এক যুবক তার বাবা-মাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন পোস্টকার্ডে। তিনি ভেবেছিলেন, চিঠি পৌঁছে যাবে ঠিক ঠিক গন্তব্যে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সেটি বাবা-মায়ের হাতে পৌঁছায়নি। ৭২ বছর ধরে হারিয়ে থাকা সেই চিঠি অবশেষে ফিরে এসেছে, কিন্তু গন্তব্যে নয় — বরং প্রেরকের কাছেই।
ঘটনাটি ঘটেছিল আমেরিকার নিউ ইয়র্কে। অ্যালান বল নামে এক তরুণ তখন মাত্র ১৬ বছরের। বাবামায়ের কাছে স্নেহভরা কিছু কথা লিখে পাঠিয়েছিলেন তিনি একটি সাধারণ পোস্টকার্ডে। চিঠি পাঠানোর পর তিনি নিশ্চিত ছিলেন, বাবা-মা সেটি পেয়ে যাবেন।
চিঠি পাঠানোর কিছুদিন পরই অ্যালান গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটাতে চলে যান পুয়ের্তো রিকো। নিশ্চিন্ত মনে কাটিয়ে দেন ছুটি। কিন্তু চিঠিটি যে বাবামায়ের হাতে পৌঁছায়নি, তা তিনি কোনোদিনই জানতেই পারেননি।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়। আমেরিকার ইলিনয়ের এক ডাকঘরে হঠাৎই পাওয়া যায় একটি পুরনো পোস্টকার্ড। ডাকবিভাগের কর্মীরা সেটি হাতে নিয়ে প্রথমে হতভম্ব হয়ে যান। চিঠির তারিখ দেখে বোঝা গেল, এটি ১৯৫৩ সালে নিউ ইয়র্ক থেকে পাঠানো হয়েছিল।
পোস্টমাস্টার প্রথমে অবাক হন। এত বছর ধরে চিঠিটি কোথায় ছিল? তদন্ত করে জানা গেল, সম্ভবত ডাকবিভাগেরই কোনো অজানা খাঁজে আটকে গিয়েছিল পোস্টকার্ডটি। এতদিন কারও চোখে না পড়ায় এটি সেভাবেই থেকে যায়। সম্প্রতি নিয়মিত পরিদর্শনের সময় সেটি খুঁজে পাওয়া যায় এবং দ্রুত সেটি ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
চিঠির প্রেরকের নাম ও ঠিকানা দেখে শুরু হয় অনুসন্ধান। অবশেষে খোঁজ মেলে তখনকার সেই যুবকের। ৮৮ বছর বয়সী অ্যালান বল এখন থাকেন আইডাহো অঙ্গরাজ্যের স্যান্ডপয়েন্ট নামের এক শান্ত শহরে।
ডাকবিভাগ তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রথমে তিনি কিছুই মনে করতে পারেননি। এত বছর আগের কোনো চিঠি তিনি সত্যিই লিখেছিলেন কিনা, সেটিও ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ডাকবিভাগের পাঠানো চিঠির ছবিটি দেখার পর মুহূর্তেই চিনে ফেললেন নিজের হাতের লেখা।
৭২ বছর পর নিজের লেখা চিঠি হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অ্যালান বল। ডাকবিভাগের ভুলে হারিয়ে যাওয়া সেই পোস্টকার্ডটি অবশেষে তার কাছেই ফিরল। একদিকে বিস্ময়, অন্যদিকে স্মৃতির ঢেউ—এ যেন এক অসাধারণ অনুভূতি।
তিনি বলেন, “আমার জীবনের এত লম্বা সময় কেটে গেছে, অথচ সেই ছোট্ট কাগজের টুকরো এখনও আমার কাছে ফিরে এসেছে। মনে হচ্ছে, যেন সময়ও আমার সঙ্গে একটা খেলা খেলেছে।”
পোস্টমাস্টার স্বীকার করেছেন, এটি ডাকবিভাগের গাফিলতিরই ফল। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি চিঠি ভুলবশত হারিয়ে গিয়েছিল। তবে তিনি একইসঙ্গে খুশি যে, অবশেষে এত বছর পর হলেও চিঠিটি প্রেরকের হাতে ফিরিয়ে দিতে পেরেছেন।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়, আবার একদিন হঠাৎই তা ফিরে আসে। একটি পোস্টকার্ডের যাত্রাপথ শুধু নয়, অ্যালান বলের জীবনের ইতিহাসেও এটি এক অনন্য অধ্যায় হয়ে রইল।
এই গল্প শুধু ডাকবিভাগের একটি ভুলের কথা নয়; এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, চিঠির আবেগ কতটা গভীর হতে পারে। এখনকার প্রজন্ম হয়তো কাগুজে চিঠির অনুভূতি বোঝে না, কিন্তু অ্যালানের কাছে এই পোস্টকার্ডটি নিছক এক কাগজ নয়—এটি তার অতীতের এক টুকরো স্মৃতি।


