সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে এক তরুণী পুলিশের দ্বারস্থ হয়ে এমন এক অভিযোগ তুলেছেন, যা সমাজে গভীর আলোড়ন তুলেছে। স্বামী নাকি স্ত্রীকে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা জিম করতে বাধ্য করতেন, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিতেন, এমনকি গর্ভপাত করানোর অভিযোগও উঠেছে। কারণ একটাই— স্ত্রীর চেহারা নাকি হতে হবে বলিউড তারকা নোরা ফাতেহির মতো। এই ঘটনায় সামাজিক মানসিকতা, কুসংস্কার ও নারীর প্রতি অমানবিক আচরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিয়ের পরদিন থেকেই ওই তরুণীর স্বামী তাঁর স্ত্রীর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি প্রায়শই স্ত্রীর চেহারা নিয়ে বিদ্রুপ করতেন। নোরা ফাতেহির ফিটনেস ও শারীরিক গঠনকে আদর্শ মানতে গিয়ে স্ত্রীকে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা জিম করতে বাধ্য করতেন। শুধু তাই নয়, খাবারের পরিমাণও নিয়ন্ত্রণ করতেন, কখনও কখনও না খাওয়িয়েই দিন কাটাতে হতো তাঁকে।
তরুণী জানিয়েছেন, স্বামী শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও তাঁকে নির্যাতন করতেন। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে বঞ্চিত করে তিনি স্ত্রীকে কেবল শরীরচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইতেন। ক্রমাগত অপমান ও গঞ্জনা তরুণীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে থাকে।
নির্যাতনের মাঝেই তরুণী গর্ভবতী হয়ে পড়েন। কিন্তু সুখবরটি পরিবারে আনন্দ না এনে বরং ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, স্বামী একদিন তাঁকে ওষুধ খেতে দেন। পরে ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন এটি গর্ভপাত ঘটানোর ওষুধ। ফলস্বরূপ তাঁর গর্ভপাত ঘটে যায়। এ ঘটনা ছিল নির্যাতনের এক ভয়াবহ রূপ, যা শেষ পর্যন্ত তাঁকে পুলিশের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করে।
তরুণীর দাবি অনুযায়ী, তাঁর বিয়েতে প্রায় ৭৬ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল। দামি গাড়ি, ১০ লক্ষ টাকা নগদ অর্থ এবং স্বর্ণালঙ্কার সবই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপরও স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকেরা নতুন করে আরও টাকার দাবি জানাতে থাকেন। পণের চাপ, অপমান ও নির্যাতনে জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে তাঁর।
অভিযুক্ত স্বামী একজন সরকারি স্কুলের শারীরশিক্ষার শিক্ষক। যিনি নিজেই স্বাস্থ্য ও ফিটনেস নিয়ে পড়ান, সেই ব্যক্তি স্ত্রীকে নোরা ফাতেহির মতো দেখতে না হওয়ায় মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছেন— এমন অভিযোগে অনেকেই বিস্মিত। সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর নেটিজেনরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং একে নারীর প্রতি গভীর অবমাননা হিসেবে দেখছেন।
এই ঘটনা কেবল একটি পারিবারিক নির্যাতন নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। নারীর সৌন্দর্য বা শরীরের গঠন নিয়ে চাপ সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সৌন্দর্যকে আদর্শে পরিণত করে নির্যাতন চালানো কেবল মানবাধিকারের লঙ্ঘন নয়, এটি মানসিক সহিংসতার ভয়াবহ উদাহরণ।
গাজিয়াবাদের এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে। নোরা ফাতেহির মতো হতে বাধ্য করার মানসিকতা শুধু অন্যায় নয়, এটি আইনের চোখেও অপরাধ। প্রতিটি নারীই অনন্য, এবং তাঁদের ইচ্ছা ও স্বপ্নকে সম্মান জানানোই হলো প্রকৃত মানবিকতা।


