ক্রিকেট মানেই আবেগ। আর সেই আবেগ যদি হয় ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে ঘিরে, তাহলে তো কথাই নেই। মাঠের লড়াই শুধু খেলোয়াড়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা ছড়িয়ে পড়ে সমর্থকদের হৃদয়ে। এবারের টি-২০ বিশ্বকাপ ম্যাচেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভারতের কাছে বড় ব্যবধানে হারের পর পাকিস্তানে আবারও সামনে এল বহুদিনের আলোচিত “টিভি ভাঙার” ঘটনা। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
ক্রিকেট বিশ্বে ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বরাবরই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। টি-২০ বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই দল আগে আটবার মুখোমুখি হয়েছে। তার মধ্যে সাতবার জয় পেয়েছে ভারত। তাই এবারের ম্যাচের আগে পাকিস্তানি সমর্থকদের মনে একরাশ আশা ছিল—হয়তো এবার ইতিহাস বদলাবে।
শ্রীলঙ্কার মাটিতে পুরো টুর্নামেন্ট খেলছিল পাকিস্তান। একই পরিবেশ, একই পিচ, একই আবহাওয়ায় খেলার সুবিধা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে প্রথম ওভারেই অভিষেক শর্মা আউট হওয়ায় ম্যাচে পাকিস্তানের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু ক্রিকেট এমনই খেলা, যেখানে এক মুহূর্তেই সব বদলে যেতে পারে।
এই ম্যাচের প্রকৃত নায়ক হয়ে ওঠেন ভারতের তরুণ ব্যাটার ঈশান কিষান। কঠিন পিচে যেখানে অন্য ব্যাটাররা রান তুলতে হিমশিম খাচ্ছিলেন, সেখানে ঈশান যেন অন্য ছন্দে খেলছিলেন। মাত্র ৪০ বলে ৭৭ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন তিনি। তার শট নির্বাচনের আত্মবিশ্বাস আর সময়জ্ঞান পাকিস্তানি বোলারদের চাপে ফেলে দেয়।
ভারত নির্ধারিত ওভারে তোলে ১৭৫ রান। এই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায়। ভারতের বোলিং আক্রমণ ধারাবাহিকভাবে উইকেট নিতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১১৪ রানে অলআউট হয়ে যায় পাকিস্তান। ৬১ রানের বিশাল ব্যবধানে ম্যাচ জিতে ভারত জায়গা করে নেয় সুপার এইটে।
এই ফলাফল শুধু স্কোরবোর্ডে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা প্রভাব ফেলেছে লাখো সমর্থকের আবেগেও।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একাধিক ভিডিও। সেখানে দেখা যায়, এক পাকিস্তানি সমর্থক ব্যাট দিয়ে আঘাত করে নিজের টিভি ভেঙে ফেলছেন। টিভি চুরমার হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে, আর সেই দৃশ্য নিজেই শেয়ার করেছেন তিনি।
অনেকে বলছেন, এটি শুধুই হতাশার বহিঃপ্রকাশ। আবার কেউ কেউ দাবি করছেন, সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্যই এমন কাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল হতেই “পাকিস্তানে হার মানেই টিভি ভাঙা” এই পুরনো কথাটি আবারও সামনে আসে।
ক্রিকেটে হার-জিত থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আবেগ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন এমন দৃশ্যই তৈরি হয়।
ম্যাচ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, পাকিস্তান ব্যাটিং বিভাগে বড় ধাক্কা খেয়েছে। শুরুতেই দ্রুত উইকেট হারানো এবং মাঝের ওভারে রান তোলার গতি কমে যাওয়া দলকে চাপে ফেলে দেয়। ১৭৫ রানের লক্ষ্য টি-২০ ক্রিকেটে অসম্ভব নয়। কিন্তু পরিকল্পনার অভাব এবং মানসিক চাপ পাকিস্তানকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেয়।
অন্যদিকে ভারত পুরো ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। ব্যাটিংয়ে আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং বোলিংয়ে শৃঙ্খলাপূর্ণ লাইন-লেন্থ ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। বিশেষ করে ঈশান কিষানের ইনিংস দলকে এমন জায়গায় পৌঁছে দেয়, যেখান থেকে পাকিস্তানের ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই বাড়তি উত্তেজনা। দুই দেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও তীব্র করে তোলে। তাই এই ম্যাচে হার মানে অনেক সমর্থকের কাছে শুধু খেলায় পরাজয় নয়, যেন ব্যক্তিগত হতাশা।
তবে বাস্তবতা হলো, ক্রিকেট শেষ পর্যন্ত একটি খেলা। এখানে কখনও আপনি জিতবেন, কখনও হারবেন। ইতিহাস বলছে, টি-২০ বিশ্বকাপে ভারত ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে। কিন্তু ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বদলাতেই পারে। খেলায় কোনো ফলাফল স্থায়ী নয়।
আজকের দিনে একটি ভিডিও মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। সেই ভিডিওই হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। পাকিস্তানি সমর্থকের টিভি ভাঙার ভিডিওও ঠিক তেমনই ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এগুলো কি বাস্তব হতাশা, নাকি সোশ্যাল মিডিয়া জনপ্রিয়তার খেলা?
অনেক সময় মানুষ ক্যামেরার সামনে নিজের আবেগকে বাড়িয়ে দেখায়। বিশেষ করে যখন জানে, ভিডিওটি হাজার হাজার মানুষ দেখবে। তাই এই ঘটনাগুলিকে শুধুই জাতীয় আবেগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
ভারতের ৬১ রানের জয়ে টি-২০ বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও প্রমাণিত হলো তাদের আধিপত্য। ঈশান কিষানের দুর্ধর্ষ ব্যাটিং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পাকিস্তানের জন্য এটি হতাশার ম্যাচ হলেও, সামনে সুযোগ রয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর।
সমর্থকদের জন্যও একটি বার্তা রয়ে যায়—ক্রিকেট উপভোগের খেলা। টিভি ভাঙলে ম্যাচের ফল বদলায় না, বরং ক্ষতি হয় নিজেরই। আবেগ থাকুক, উচ্ছ্বাস থাকুক, কিন্তু সেটি যেন আনন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
কারণ শেষ পর্যন্ত, ক্রিকেট আমাদের এক করে। আর পরের ম্যাচেই গল্প বদলে যেতে পারে।


