ভারতে গরমের মরশুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। মার্চ মাস থেকেই অনেক অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, চলতি বছরে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং বিশেষ করে El Niño–এর সম্ভাব্য প্রভাবের কারণে আগামী কয়েক মাসে তীব্র গরম অনুভূত হতে পারে। পাশাপাশি বর্ষাকালেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এল নিনোর প্রভাব শক্তিশালী হয়, তাহলে শুধু তাপমাত্রাই বাড়বে না—বরং বৃষ্টিপাতের ধরণেও পরিবর্তন আসতে পারে। এর ফলে কৃষি, জলসম্পদ এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
ভারতের আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, আগামী কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকতে পারে। বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীর এবং হিমাচল প্রদেশের মতো তুলনামূলক ঠান্ডা অঞ্চলেও দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৫ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকতে পারে।
অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিম ভারতের সমতল অঞ্চলে—যেমন দিল্লি ও গুজরাটে—তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণত এই সময়টায় আবহাওয়া এতটা উষ্ণ থাকে না। তাই এই দ্রুত উষ্ণতা বৃদ্ধিকে আবহাওয়াবিদরা গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছেন।
এই ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শহরাঞ্চলে তাপমাত্রা আরও বেশি অনুভূত হয়, কারণ কংক্রিটের ভবন ও যানবাহনের তাপ জমে থাকে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বের আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে World Meteorological Organization। তাদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে গড় তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
বিশেষ করে মার্চ থেকে মে—এই সময়টায় স্থলভাগের তাপমাত্রা অনেক জায়গায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। এই প্রবণতা ভারতের আবহাওয়াতেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মৌসুমি আবহাওয়ার ধরণ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট সময়ে গরম, বর্ষা বা শীত আসত, এখন সেই সময়সূচি অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কখনও হঠাৎ অতিরিক্ত গরম, আবার কখনও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত—এই ধরনের ঘটনা বাড়ছে।
অনেকেই প্রশ্ন করেন—এল নিনো আসলে কী? সহজভাবে বললে, প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাংশে, বিশেষ করে পেরুর উপকূলের কাছাকাছি অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সেই ঘটনাকে এল নিনো বলা হয়।
এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি সাধারণত কয়েক ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়লে তার প্রভাব শুধু সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বায়ুমণ্ডলের সঞ্চালন, বৃষ্টিপাতের ধরণ এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া এতে পরিবর্তিত হয়।
সাধারণত ২ থেকে ৭ বছর অন্তর এল নিনো দেখা যায়। যখন এটি সক্রিয় থাকে, তখন পৃথিবীর অনেক দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা অথবা অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
ভারতের আবহাওয়ার ক্ষেত্রে এল নিনোর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বর্ষাকালের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের কৃষি ব্যবস্থার বড় অংশই নির্ভর করে বর্ষার উপর। যদি এল নিনোর কারণে বৃষ্টিপাত কম হয়, তাহলে ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং কৃষকদের আর্থিক সমস্যাও বাড়তে পারে।
এছাড়াও কম বৃষ্টিপাত হলে জলাধার ও নদীগুলোর পানির স্তর কমে যেতে পারে। এতে পানীয় জল এবং সেচের জন্য জল সংকট তৈরি হতে পারে।
যদিও এল নিনোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে, তবুও অনেক আবহাওয়াবিদ মনে করেন এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
ভারতের ভূ-বিজ্ঞান মন্ত্রকের প্রাক্তন সচিব মাধবন রাজীবনের মতে, মরশুমের দ্বিতীয়ার্ধে এল নিনোর প্রভাব স্পষ্ট হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে এর মাত্রা কতটা হবে তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
তার মতে, জুন মাসের কাছাকাছি সময় গেলে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে। তখন সমুদ্রের তাপমাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে এল নিনোর প্রকৃত প্রভাব বোঝা সহজ হবে।
তীব্র গরম শুধু অস্বস্তির বিষয় নয়—এটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রায় থাকলে হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন এবং ক্লান্তির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং যারা খোলা জায়গায় কাজ করেন—তাদের জন্য ঝুঁকি বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নির্মাণ শ্রমিক বা কৃষকরা দিনের বেশিরভাগ সময় রোদে কাজ করেন। তাপমাত্রা বেশি হলে তাদের জন্য কাজ করা খুব কঠিন হয়ে যায়।
এছাড়াও অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়, কারণ সবাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা ফ্যান বেশি ব্যবহার করতে শুরু করেন। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উপরও চাপ পড়ে।
যদি এল নিনোর কারণে বর্ষা দুর্বল হয়, তাহলে কৃষি উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। ধান, গম, ডালসহ অনেক ফসলই নির্দিষ্ট পরিমাণ বৃষ্টির উপর নির্ভর করে।
যখন বৃষ্টিপাত কম হয়, তখন কৃষকদের সেচের জন্য অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
এর প্রভাব শুধু কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে বাজারে দাম বাড়তে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপরও প্রভাব ফেলে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা এখন পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন। সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলের প্রবাহ এবং অন্যান্য আবহাওয়াগত সূচক বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস তৈরি করা হচ্ছে।
যদি এল নিনোর প্রভাব বাড়তে থাকে, তাহলে আগামী কয়েক মাসে ভারতে গরম আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি বর্ষার সময় বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কম হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে আবহাওয়ার মতো জটিল বিষয় অনেক সময় দ্রুত বদলে যায়। তাই চূড়ান্ত পরিস্থিতি বোঝার জন্য আগামী কয়েক মাসের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চলতি বছরে গরমের তীব্রতা বাড়ার সম্ভাবনা ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। আর যদি এল নিনোর প্রভাব শক্তিশালী হয়, তাহলে তা ভারতের আবহাওয়া এবং বর্ষা—দুটোর উপরই উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আবহাওয়ার এই পরিবর্তন নিয়ে সচেতন থাকা এবং আগাম প্রস্তুতি নেওয়া এখন সময়ের দাবি।


