শীত এবার যেন কোনো রকম ছাড় দিচ্ছে না। জানুয়ারির শুরুতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জাঁকিয়ে বসেছে কনকনে ঠান্ডা। আবহাওয়া দপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার (৭ জানুয়ারি) বাংলাদেশের অন্তত ১০টি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কুয়াশা, আর তাতেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
আবহাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি কী বলছে?
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাতে প্রকাশিত নিয়মিত আবহাওয়া বুলেটিনে জানানো হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন পূর্ব নিরক্ষীয় ভারত মহাসাগর এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এটি ইতিমধ্যেই সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়ে একই এলাকায় অবস্থান করছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই লঘুচাপ আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে এগোতে পারে এবং ধীরে ধীরে ঘণীভূত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এই লঘুচাপের একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। পাশাপাশি উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের একটি অংশ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থান করছে। এই দুই আবহাওয়াগত ব্যবস্থার মিলিত প্রভাবেই মূলত দেশে শীতের তীব্রতা বাড়ছে।
আগামী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাস
আবহাওয়া দপ্তরের মতে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের আকাশ আংশিক মেঘলা থাকতে পারে, তবে আবহাওয়া মোটের উপর শুষ্কই থাকবে। বড় কোনো বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। কিন্তু শীতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কুয়াশা।
মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। কোথাও কোথাও এই কুয়াশা দুপুর পর্যন্তও কাটতে নাও পারে। সূর্যের আলো ঠিকমতো না পৌঁছানোর কারণে দিনের বেলাতেও ঠান্ডার অনুভূতি কমবে না।
কুয়াশার প্রভাব: যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন
ঘন কুয়াশার কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। আবহাওয়া দপ্তর সতর্ক করেছে, কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন এবং সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
সকালে মহাসড়কে গাড়ি চলাচল ধীর হয়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। নদীপথে চলাচলকারী নৌযানগুলোকে অতিরিক্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কোন কোন জেলায় শৈত্যপ্রবাহ চলছে?
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ১০টি জেলার ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এই জেলাগুলো হলো রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রাঙামাটি, যশোর, চুয়াডাঙ্গা এবং কুষ্টিয়া।
এই সব এলাকায় মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ অনুভূত হচ্ছে। রাতের তাপমাত্রা বেশ নিচে নেমে যাচ্ছে, আর দিনের বেলাতেও সূর্যের দেখা না মেলায় শীতের দাপট কমছে না।
তাপমাত্রা কি বাড়ছে, নাকি বাড়ছে শুধু কষ্ট?
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সামগ্রিকভাবে দেশের রাত এবং দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। তবে বাস্তবে সেই উষ্ণতা খুব একটা অনুভূত হবে না। কারণ কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার জন্য বাতাসে স্যাঁতসেঁতে ভাব রয়ে যাচ্ছে।
এই স্যাঁতসেঁতে ঠান্ডাই মানুষের শরীরে বেশি কাঁপুনি ধরাচ্ছে। অনেকেই বলছেন, থার্মোমিটারে তাপমাত্রা একটু বাড়লেও শীতের অনুভূতি আগের মতোই তীব্র।
রাজশাহীতে ৭ ডিগ্রি: শীতের চরম রূপ
মঙ্গলবার রাজশাহীতে তাপমাত্রা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এটি চলতি শীত মৌসুমে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রাগুলোর একটি। রাজশাহী অঞ্চলে সকালে ঘন কুয়াশা আর হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে রাজধানী ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় শৈত্যপ্রবাহ না থাকলেও কুয়াশা ও ঠান্ডা বাতাসের কারণে শীতের অনুভূতি স্পষ্ট।
কুয়াশা কেন কাটছে না? জানালেন আবহাওয়াবিদ
আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ জানিয়েছেন, বাতাসে দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় কুয়াশা সহজে কাটছে না। তাঁর মতে, বায়ু দূষণের কারণে বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার পরিমাণ বেড়েছে। এই কণাগুলো কুয়াশাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।
ফলে সূর্যের আলো ঠিকমতো ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারছে না। দিনের বেলাতেও আলো কম থাকায় তাপমাত্রা বাড়লেও শরীরে উষ্ণতার অনুভূতি মিলছে না। এতে শীত আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।
খেটে খাওয়া মানুষের দুর্দশা চরমে
তীব্র শীত সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষদের। দিনমজুর, রিকশাচালক, কৃষিশ্রমিকদের জন্য এই ঠান্ডা যেন এক বড় পরীক্ষা। অনেকেই কাজের জন্য ভোরে বের হতে পারছেন না। কাজ কমে যাওয়ায় আয়ও কমছে।
রাতে খোলা আকাশের নিচে থাকা মানুষদের অবস্থা আরও করুণ। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
হাসপাতালে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগী
শীতের প্রভাবে হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিচ্ছেন, শীতের এই সময়ে সবাইকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে।
বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণদের গরম কাপড়ে ঢেকে রাখা, ঠান্ডা এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন ছাড়া ভোরে বা গভীর রাতে বাইরে না যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
সব মিলিয়ে বলা যায়, শীত এখনই বিদায় নিচ্ছে না। শৈত্যপ্রবাহের জেলাগুলোতে পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন একই রকম থাকতে পারে। কুয়াশার দাপট কমতে সময় লাগবে, আর তত দিন শীতের অনুভূতিও বজায় থাকবে।
আবহাওয়া দপ্তরের নিয়মিত আপডেটের দিকে নজর রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শীতের এই দাপটে একটু অসতর্কতাই বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


