কলকাতা জুড়ে এখন যেন শীতের আসল ইনিংস। টানা কয়েক দিন ধরেই ১০ ডিগ্রির আশপাশে ঘোরাফেরা করছে তাপমাত্রা। মঙ্গলবার সকালে শহরের পারদ নেমে গিয়েছিল ১০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সঙ্গে ছিল কনকনে ঠান্ডা হাওয়া আর ঘন কুয়াশার দাপট। ভোর থেকে সকাল—সব মিলিয়ে কলকাতার চেনা ছবিটাই বদলে গিয়েছিল। দিনের বেলাতেও ঠান্ডার হাত থেকে রেহাই মেলেনি। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা আটকে ছিল মাত্র ১৮ ডিগ্রিতে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৭ ডিগ্রি কম।
চলতি মরসুমের শীতলতম দিন কলকাতায়
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবারই ছিল এই শীতের মরসুমে কলকাতার সবচেয়ে ঠান্ডা দিন। বহু বছর আগের স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়েছে এই তাপমাত্রা। এই শতকে কলকাতায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছিল ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি। সেদিন পারদ নেমেছিল ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। চলতি শীত এখনও সেই রেকর্ড ছুঁতে না পারলেও খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে।
বুধবার ভোরেও শীতের দাপট একটুও কমেনি। সকালের দিকে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মঙ্গলবারের তুলনায় মাত্র ০.১ ডিগ্রি বেশি হলেও স্বাভাবিকের থেকে এখনও ৩.৬ ডিগ্রি কম। অর্থাৎ, ঠান্ডা কিছুটা নরম হলেও শীতের কামড় এখনও বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে।
দক্ষিণবঙ্গে কত দিন চলবে এই ঠান্ডা?
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আপাতত স্বস্তির কোনো সম্ভাবনা নেই। শনিবার পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে একই রকম শীতের পরিস্থিতি বজায় থাকবে। ভোর ও রাতের তাপমাত্রায় তেমন বড় কোনো পরিবর্তন হবে না। দিনের তাপমাত্রাও আগামী দু’দিন স্বাভাবিকের থেকে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি কম থাকতে পারে।
তবে একটু ভালো খবরও আছে। হাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, তিন দিনের পর থেকে রাতের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করবে। মোটামুটি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পারদ চড়তে পারে। যদিও তার মানে এই নয় যে শীত পুরোপুরি বিদায় নেবে। ঠান্ডা থাকবে, তবে তীব্রতা কিছুটা কমবে।
পশ্চিমের জেলাগুলিতে শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা
কলকাতার পাশাপাশি পশ্চিমের কয়েকটি জেলায় শীত আরও কড়া রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে পূর্ব বর্ধমান ও বীরভূমে বৃহস্পতিবার শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বীরভূমে এই অবস্থা শুক্রবার সকাল পর্যন্তও চলতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
শৈত্যপ্রবাহ মানে শুধু ঠান্ডা নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে খুব কম তাপমাত্রা। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি কৃষির উপরও প্রভাব পড়ে। ফলে এই জেলাগুলিতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
‘শীতল দিন’ থাকবে আরও কয়েকটি জেলায়
আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, দক্ষিণবঙ্গের আরও ছয়টি জেলায় ‘শীতল দিন’-এর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ‘শীতল দিন’ তখনই ঘোষণা করা হয়, যখন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি বা তার কম থাকে এবং দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অন্তত ৪.৫ ডিগ্রি কম হয়।
যে জেলাগুলিতে এই পরিস্থিতি থাকতে পারে, সেগুলি হল হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পশ্চিম বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ এবং নদিয়া। এই সব জায়গায় দিনের বেলাতেও রোদের উষ্ণতা খুব একটা টের পাওয়া যাবে না।
উত্তরবঙ্গে শৈত্যপ্রবাহ নয়, তবে ঠান্ডা কম নয়
এই মুহূর্তে উত্তরবঙ্গে শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা না থাকলেও ঠান্ডা যে কম, তা কিন্তু নয়। উত্তরবঙ্গের বেশির ভাগ জেলায় দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি কম থাকতে পারে। পাহাড়ি এলাকাগুলিতে ঠান্ডা আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।
কুয়াশার দাপট বাড়াচ্ছে ভোগান্তি
ঠান্ডার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশাও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শনিবার পর্যন্ত কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের সব জেলাতেই ভোরের দিকে কুয়াশা থাকবে। কোথাও কোথাও দৃশ্যমানতা নেমে যেতে পারে ৯৯৯ থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে।
বিশেষ করে উত্তর ২৪ পরগনা, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ায় ঘন কুয়াশার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এসব এলাকায় সকালে রাস্তাঘাটে চলাচলে সমস্যা হতে পারে। গাড়িচালকদের বাড়তি সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া দফতর।
উত্তরবঙ্গে ঘন কুয়াশার সতর্কতা
উত্তরবঙ্গে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। আটটি জেলায় ঘন কুয়াশার পূর্বাভাস রয়েছে, যেখানে দৃশ্যমানতা নেমে যেতে পারে মাত্র ১৯৯ থেকে ৫০ মিটারে। বুধবারের জন্য এই জেলাগুলিতে হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবারও দার্জিলিং ও জলপাইগুড়িতে ঘন কুয়াশার সম্ভাবনা থাকছে।
সার্বিক পরিস্থিতি: শীত এখনই বিদায় নিচ্ছে না
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলায় শীত এখনই ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাচ্ছে না। কলকাতায় পারদ ১০-এর ঘরেই ঘোরাফেরা করবে আরও কয়েক দিন। পশ্চিমের জেলাগুলিতে শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনই কুয়াশার দাপটে বাড়বে দৈনন্দিন ভোগান্তি।
যাঁরা সকালে বেরোন, তাঁদের জন্য গরম জামাকাপড় এখনও ভীষণ জরুরি। আর শীতপ্রেমীদের জন্য অবশ্য এই সময়টা বেশ উপভোগ্য। তবে আবহাওয়া যে কোনো মুহূর্তে বদলাতে পারে, তাই নিয়মিত আপডেটের দিকে নজর রাখাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।


