যশোরে চলমান টানা শীত ও শৈত্যপ্রবাহে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দিনের পর দিন তাপমাত্রা কম থাকায় জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। বিশেষ করে ছিন্নমূল, দিনমজুর, রিকশাচালক ও নিম্ন আয়ের মানুষেরা পড়েছেন ভয়াবহ সংকটে। শীতের তীব্রতা কিছুটা কমার আভাস মিললেও কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ার কারণে দুর্ভোগ কমেনি বরং আরও বেড়েছে।
যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি
যশোর বিমান বাহিনীর আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রোববার ভোরে যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই দিনে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে, ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন শনিবার যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শুক্রবার তা আরও নেমে দাঁড়ায় ৮ ডিগ্রিতে এবং বৃহস্পতিবার রেকর্ড হয় ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা টানা দুই দিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হিসেবে বিবেচিত হয়।
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকেই যশোরে শীতের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। ২৬ ও ২৭ ডিসেম্বর যশোরে তাপমাত্রা ছিল যথাক্রমে ৯ ডিগ্রি ও ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই ধারাবাহিক নিম্ন তাপমাত্রা যশোরকে কার্যত শৈত্যপ্রবাহ কবলিত অঞ্চলে পরিণত করেছে।
শৈত্যপ্রবাহ কী এবং যশোর কোন স্তরে?
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৮ দশমিক ১ ডিগ্রি থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নেমে এলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। ৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রির মধ্যে হলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ, ৪ দশমিক ১ থেকে ৬ ডিগ্রির মধ্যে হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ এবং ৪ ডিগ্রির নিচে নামলে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়। যশোরে বর্তমানে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের অবস্থা বিরাজ করছে, তবে কুয়াশা ও হিমেল বাতাস পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় স্থবির জনজীবন
শনিবার রাত থেকেই যশোরজুড়ে ঘন কুয়াশার চাদর নেমে আসে। রোববার ভোরে চারদিক ঢেকে যায় সাদা কুয়াশায়। সূর্য উঠলেও তার আলো ছিল ক্ষীণ, যা শীত কমাতে ব্যর্থ হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা কিছুটা কেটে গেলেও শীতের অনুভূতি রয়ে যায়। সকাল ও সন্ধ্যার সময় শীতের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে, আর রাত নামলেই শুরু হচ্ছে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা।
দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ও যানবাহন সংকট
চরম শীতের কারণে যশোর শহরের স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য অনেকটাই কমে গেছে। মানুষজন মোটা জ্যাকেট, সোয়েটার, মাফলার ও কম্বলে নিজেকে মুড়ে বাইরে বের হচ্ছেন। অনেকেই অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। রাস্তায় রিকশা ও অটোরিকশার সংখ্যা কমে যাওয়ায় অফিসফেরত মানুষদের অনেককে হেঁটেই বাড়ি ফিরতে দেখা যাচ্ছে। এতে দৈনন্দিন জীবন আরও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষের চরম দুর্ভোগ
শীতের সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসে পড়েছে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলোর ওপর। প্রতিদিন শহরের লালদীঘির পাড়ে যে শ্রমিক সমাবেশ বসত, তা এখন অনেকটাই ফাঁকা। কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে অনেকের।
বলাডাঙ্গা কাজীপুর এলাকার শ্রমিক রহিম আলী জানান, টানা চার দিন কাজ না পেয়ে পরিবার নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছেন। শনিবার আধবেলা কাজ পেয়ে যে সামান্য টাকা পেয়েছেন, তা দিয়েই কোনোমতে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু পরবর্তী দিনের খাবার কীভাবে জুটবে, তা নিয়েই দুশ্চিন্তা।
শীতে রিকশাচালকদের সংগ্রাম
শহরের নাজির শংকরপুর এলাকার রিকশাচালক আবুল কাশেম বলেন, শীতে রিকশা চালানো এখন অনেক কঠিন। সকাল ও রাতে ঠান্ডা বাতাসে শরীর অবশ হয়ে আসে। যাত্রীও কমে গেছে। তবুও পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে রিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি।
আগুনের ওমই শেষ ভরসা
প্রচণ্ড শীতে শুধু গরম কাপড় যথেষ্ট হচ্ছে না। তাই গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন স্থানে মানুষজনকে কাঠ, খড়কুটো, কাগজ কিংবা শুকনো পাতা জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে দেখা যাচ্ছে। রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, অফিস-আদালতের বারান্দা ও ফুটপাতে রাত কাটানো মানুষগুলো শীতে জুবুথুবু হয়ে আগুনের চারপাশে জড়ো হচ্ছেন।
শীত মোকাবিলায় প্রয়োজন দ্রুত সহায়তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য জরুরি ভিত্তিতে শীতবস্ত্র বিতরণ, আশ্রয়কেন্দ্র খোলা এবং চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিশু ও বয়স্কদের জন্য শীত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তাদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।


